শফিকুল ইসলাম সাফা, চিতলমারী
গ্রীষ্ম মৌসুমে একটু শীতল পরশ পেতে বৈদ্যুতিক পাখার পাশাপাশি তালপাতার হাতপাখার কদর এখনো রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এই পাখার ব্যবহার এখনো প্রচলিত। দিন দিন লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এই পাখার চাহিদা বাড়ছে। ফলে বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার ডাকাতিয়া, কৃষ্ণনগরসহ অন্যান্য গ্রামের অনেক পরিবার এই পাখা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, আসছে পহেলা বৈশাখকে ঘিরে পাখা তৈরির কাজে কারিগরদের এক মুহূর্তও ফুসরত নেই। রাত-দিন সমান তালে তৈরি করছেন পাখা। আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরই বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ পালিত হবে। এ উৎসবকে ঘিরে গ্রামে-গঞ্জে বসবে মেলা। বেলুন, বাঁশি ও নানা ধরনের খেলনার পাশাপাশি এ মেলায় তালপাতার পাখার কদর রয়েছে, যা আবহমানকাল ধরে এলাকায় প্রচলিত।
এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের অসংখ্য নারী-পুরুষ পাখা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। মৌসুমি পেশা হিসেবে অনেকেই তালপাতার পাখা তৈরি করে বাড়তি অর্থ উপার্জন করছেন।
প্রচণ্ড গরমে যখন বিদ্যুতের লোডশেডিং শুরু হয়, তখন একটু স্বস্তি পেতে তালপাতার হাতপাখার জুড়ি মেলা ভার। এজন্য বৈদ্যুতিক পাখার পাশাপাশি এই পাখার চাহিদার কোনো কমতি নেই। এছাড়া প্রত্যন্ত গ্রামে যেসব এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি, সেখানে গরমের দিনে তাদের একমাত্র ভরসা তালপাতার হাতপাখা। পাশাপাশি বিদ্যুৎ না থাকলে শহরের মানুষের কাছেও এই পাখার বিকল্প নেই। ফলে শহরেও পাখার চাহিদা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন অনেকে।
উপজেলার ডাকাতিয়া গ্রামের দিলীপ মজুমদার, চিত্ত মজুমদার, সতীন্দ্র সাথ বালা, আকুল বালাসহ অনেকে জানান, তাদের পরিবারের নারী-পুরুষ সবাই পাখা তৈরিতে দক্ষ কারিগর। মৌসুমি পেশা হিসেবে পাখা তৈরি করে তারা বাড়তি অর্থ উপার্জন করেন। তারা আরও জানান, বলেশ্বর নদীর পাড়ে চৈত্র মাসের শেষ দিনে বিশাল মেলা বসে, যেখানে হাজার হাজার লোকের সমাগম ঘটে। এই মেলায় প্রচুর পাখার বেচাকেনা হয়। এছাড়া সারাদেশে এখানকার তৈরি পাখার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কুমিল্লা, সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, গোপালগঞ্জ ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসে পাখা কিনতে ভিড় জমান।
এখানে সাধারণত তিন ধরনের পাখা তৈরি করা হয়—বাট পাখা, ঘুল্লি পাখা ও ভাঁজপাখা। প্রতিটি পাখা ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। তবে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয় ভাঁজপাখা, যার প্রতিটির দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা।
ডাকাতিয়া গ্রামের রানা মজুমদার জানান, এখানকার অনেক পরিবারের ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনার পাশাপাশি বাড়িতে বসে হাতপাখা তৈরি করছে। এছাড়া পরিবারের অসচ্ছলতার কারণে অনেকে বিভিন্ন হস্তশিল্পের কাজ করে অর্থ উপার্জন করে থাকে। এই অর্থ দিয়ে তারা নিজেদের পড়াশোনার খরচ যোগানোর পাশাপাশি সংসারেও সহায়তা করছে।
বিশেষ করে গ্রীষ্ম মৌসুমে তালপাতার হাতপাখার কদর আগের মতোই রয়ে গেছে। যদিও বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবহার এখন ঘরে ঘরে, তবুও তালপাতার পাখার জুড়ি মেলা ভার। এ কারণে মেলা ও স্থানীয় হাট-বাজারে প্রচুর পাখা বিক্রি হয়। এছাড়া নববর্ষকে সামনে রেখে তালপাতার পাখা তৈরি করে ব্যস্ত সময় পার করছেন এলাকার মানুষজন।

