রাসেল আহমেদ, খুলনা প্রতিনিধি
খুলনা নগরীর ব্যস্ত মোড়গুলো এখন আর শুধু যানজট আর কোলাহলের প্রতীক নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে শহরের পরিচিত চিত্র। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে স্থাপিত নান্দনিক ভাস্কর্য ও প্রতীকী স্থাপনা খুলনাকে দিয়েছে এক নতুন পরিচয়। ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও অর্থনীতির বহুমাত্রিক গল্পে মোড়ানো এসব শিল্পকর্ম যেন নগরের নীরব ভাষ্যকার হয়ে উঠেছে।
শিববাড়ি মোড়ে বধূসহ পালকির ভাস্কর্য খুলনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় জমিদারি আমলে। একসময় পালকি ছিল আভিজাত্য ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। আজ ব্যস্ত সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভাস্কর্য অতীতের স্মৃতি আর বর্তমানের বাস্তবতার মধ্যে এক সেতুবন্ধন তৈরি করেছে।
নগরের আরেকটি আইল্যান্ডে স্থাপিত দুটি হরিণের ভাস্কর্য তুলে ধরছে সুন্দরবনঘেঁষা খুলনার প্রকৃতিনির্ভর পরিচয়। শহরের মাঝেই বন্যপ্রাণের এই উপস্থিতি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের বার্তা বহন করছে।
রয়েল মোড়ে স্থাপিত বাঘ ও চিংড়ির ভাস্কর্য খুলনার প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক। সুন্দরবনের বাঘ শক্তি ও সাহসের প্রতিনিধিত্ব করছে, আর চিংড়ি তুলে ধরছে খুলনার অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিকে।
জোড়াগেট মোড়ে উড্ডয়নের প্রস্তুতিতে থাকা বিমানের ভাস্কর্য আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা ও সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে গোয়ালখালী মোড়ে স্থাপিত জাহাজের ভাস্কর্য নদীবন্দরনির্ভর খুলনার শিল্প ও নৌ-বাণিজ্যের ঐতিহ্যকে সামনে এনেছে।
নগরের প্রাণকেন্দ্র নিউ মার্কেটের সামনে স্থাপিত ‘আই লাভ খুলনা’ প্রতীকটি শহরবাসীর আবেগ ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। ছবি তোলার জন্য জনপ্রিয় এই স্থাপনাটি নতুন প্রজন্মের কাছে খুলনার প্রতি ভালোবাসাকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।
সর্বশেষ সংযোজন ময়লাপোতা মোড়। সেখানে স্টিলের তৈরি গোলপাতা গাছ সুন্দরবন ও উপকূলীয় জীবনের প্রতীক হিসেবে দৃষ্টি কাড়ছে। প্রকৃত গোলপাতার আদলে নির্মিত এই ভাস্কর্য নগরের মাঝেই উপকূলের আবহ এনে দিয়েছে। একই স্থানে কংক্রিটের তৈরি ষাট গম্বুজ মসজিদের ভাস্কর্য খুলনার ধর্মীয় সংস্কৃতি ও ইসলামী স্থাপত্য ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।
এ ছাড়া বিজয় গাথা কমিউনিটি সেন্টারের সামনে সড়কের ওপর নির্মিত বিশাল বাবুই পাখির বাসা ভাস্কর্য নগরের প্রাণবৈচিত্র্য ও জনজীবনের এক অনন্য সংমিশ্রণ তৈরি করেছে।
খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এলাকার বাসিন্দা শিকদার আশিকুর রহমান বলেন, “আগে এসব মোড় ছিল ধুলো আর যানজটের জায়গা। এখন ভাস্কর্যগুলো চোখে পড়ে, থামতে ইচ্ছে করে। মনে হয় শহরটা আমাদের সঙ্গে কথা বলছে।”
সাংবাদিক জাহিদুর রহমান বলেন, “এই ভাস্কর্যগুলো শুধু সৌন্দর্যের উপকরণ নয়, বরং খুলনার ইতিহাস ও পরিচয়ের দৃশ্যমান দলিল। পরিকল্পিত সংরক্ষণ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হলে নগর সংস্কৃতিতে এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়বে।”
শিক্ষার্থী মহরমান হাসান মাহিম বলেন, “মোড়গুলোতে ভাস্কর্য বসানোর ফলে শহরটা আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাণবন্ত মনে হয়। প্রতিদিন চলার পথে এগুলো আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়। তরুণদের জন্য এটি এক ধরনের নীরব শিক্ষা।”
সব মিলিয়ে খুলনার মোড়গুলো এখন আর কেবল রাস্তার সংযোগস্থল নয়, বরং একটি শহরের আত্মকথা—যেখানে ভাস্কর্য আর প্রতীকের ভাষায় বলা হচ্ছে খুলনার অতীত, বর্তমান ও সম্ভাবনার গল্প।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.