হুমায়ন কবির মিরাজ | বেনাপোল
যশোরের শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়া ইউনিয়নের উজ্জ্বলপাড়া গ্রামে মঙ্গলবার নেমে আসে এক হৃদয়বিদারক শোকের আবহ। হঠাৎ আকাশে হেলিকপ্টারের শব্দে এলাকাবাসীর মনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এটি কোনো আনন্দের আগমন নয়, বরং বাবার শেষ দেখায় ছুটে আসা এক সন্তানের বেদনাবিধুর প্রত্যাবর্তন।
স্ট্রোকজনিত কারণে ইন্তেকাল করেছেন আলহাজ্ব দিসারত উদ্দীন (৭০)। বাবার মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পরপরই হাজার মাইল দূরে থাকা যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ছেলে আসাদুজ্জামান লিটন সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে দেশে ফেরার চেষ্টা করেন। সোমবার সকালে তিনি ঢাকায় পৌঁছান। পরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে হেলিকপ্টারে করে মঙ্গলবার সকালে নিজ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছান।
হেলিপ্যাডে অবতরণের মুহূর্তে পুরো এলাকায় নেমে আসে এক নিস্তব্ধতা। কোনো উচ্ছ্বাস কিংবা কোলাহল নয়—চারদিকে শুধু চোখের জল আর ভারী শ্বাসের শব্দ। স্বজন ও প্রতিবেশীরা নীরবে প্রত্যক্ষ করেন এক সন্তানের গভীর ভালোবাসা ও বাবাকে হারানোর অসহনীয় বেদনা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৫ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত লিটন সম্প্রতি দেশে এসে বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কিছুদিন সময় কাটিয়ে আবার বিদেশে ফিরে যান। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস—ফিরে আসতে হলো বাবার নিথর দেহের কাছে।
সোমবার ভোরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে আলহাজ্ব দিসারত উদ্দীনকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রবাসী ছেলের শেষ দেখার অপেক্ষায় মরদেহ ফ্রিজিং গাড়িতে সংরক্ষণ করে রাখা হয়।
মরহুমের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আমজাদ হোসেন গাজী বলেন, “লিটন শুধু একবার বাবার মুখটা শেষবারের মতো দেখতে চেয়েছিল। সেই টানেই সে কোনো কিছু না ভেবে রাতারাতি রওনা দেয়।”
গ্রামে পৌঁছে বাবার জানাজায় অংশ নেন লিটন এবং নিজ হাতে দাফনকার্য সম্পন্ন করেন। সেই দৃশ্য দেখে উপস্থিত অনেকের চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
এদিকে মরহুম আলহাজ্ব দিসারত উদ্দীনের জানাজা নামাজ জোহরবাদ বাগআঁচড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন যশোর-১ আসনের জামায়াত মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী মাওলানা আজিজুর রহমান, যশোর জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান, শংকরপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব নিছার উদ্দীন, শার্শা উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি মোনায়েম হোসেন, বিএনপি নেতা আক্তার হোসেনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও সন্তানের হৃদয়ের সবচেয়ে গভীর জায়গায় বাবা-মায়ের স্থান অটুট থাকে। দূরত্ব মাইলের হতে পারে, কিন্তু ভালোবাসার দূরত্ব কখনো হয় না।

