যশোর প্রতিনিধি
সেনা কল্যাণ সংস্থা ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানির এলপি গ্যাস সিলিন্ডার মিলছে না যশোরে- এমনটাই দাবি বিক্রেতাদের। তারা বলছেন, কয়েকদিন আগে অতিরিক্ত দামে দিলেও গত তিন দিনে সেটাও সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছেন ডিলাররা। এতে খুচরা বিক্রেতাদের দোকান বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকেরা। সরকারনির্ধারিত দামের চেয়েও অতিরিক্ত ২০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দিয়েও কাক্সিক্ষত সিলিন্ডার মেলাতে পারছেন না তারা।
এদিকে আমদানিকারকরা বলছেন, বৈশ্বিক যুদ্ধাবস্থার বিরূপ প্রভাব পড়েছে দেশের গ্যাসশিল্পে। আমদানিতে স্থবিরতা আসার পাশাপাশি পরিবহন খরচ বাড়ায় অস্থির হয়ে পড়েছে বাজার।
সর্বশেষ গত ৪ জানুয়ারি ১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করে দেয় সরকার। এর আগে নভেম্বর মাসে সিলিন্ডার প্রতি দাম ছিল এক হাজার ২১৫ টাকা, আর ডিসেম্বরে তা নির্ধারণ করা হয়েছিল এক হাজার ২৫৩ টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে সিলিন্ডার প্রতি দাম বাড়ানো হয়েছে ৯১ টাকা।
একপর্যায়ে ৮ জানুয়ারি ১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ ঘোষণা করে ব্যবসায়ী সমিতি। অবশ্য ওই রাতেই সে ঘোষণা থেকে সরে আসেন তারা। তবে বাজারে এর কোনো প্রভাবই পড়েনি বলে দাবি খোদ ব্যবসায়ীদেরই।
এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী মো. সাজ্জাদুল কাদের অর্ণব বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর কোম্পানিগুলো বিক্রি বন্ধের ঘোষণা থেকে সরে আসে। কিন্তু যমুনা, বসুন্ধরা, বেক্সিমকো, ওমেরার মতো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি সে কথা রাখেনি। তারা ১২ কেজির সিলিন্ডার সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে ওইসব কোম্পানির যে সিলিন্ডার আমাদের স্টকে ছিল, তা-ও শেষ হয়ে গেছে। শুধুমাত্র সেনা কল্যাণ সংস্থার সিলিন্ডার মিলছে এখন। এক্ষেত্রেও ১০০ পিচের অর্ডার দিলে ১০-১২টি করে সরবরাহ করা হচ্ছে।’
আরেক গ্যাস ব্যবসায়ী মো. ইকরামুল ইসলাম বলেন, “চাহিদা আছে কিন্তু সাপ্লাই নাই। প্রতিদিন আমরা যে কয়েকটি সিলিন্ডার পাচ্ছি, তা-ও সাড়ে ১৩শ’ থেকে ১৪শ’ টাকায় কিনতে হচ্ছে। আমরা গ্রাহকদের কাছ থেকে পরিবহন খরচ রেখে তা বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছি।”
তিনি বলেন, ‘মানুষ প্রতিদিন আসছে। কিন্তু আমাদের কাছে না থাকলে দেবো কীভাবে? আমরাও বিপাকে আছি। অনেকের সাথে কথাকাটাকাটিও হচ্ছে।’
ব্যবসায়ী এস এম মোতালেব বলেন, “আমরা এক সিলিন্ডার গ্যাস ১৪শ’ টাকা দরে বিক্রি করলেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ১৫শ’ থেকে ১৬শ’ টাকা দরে বেচছে। তাদেরকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা উচিত।”
গ্যাস না পেয়ে সবচেয়ে বেশি ভুগছেন সাধারণ মানুষ। বাসা-বাড়ি ছাড়াও যানবাহন, রেস্তোরাঁ-অফিসেও সিলিন্ডার কিম্বা তরলীকৃত এলপিজির চাহিদা রয়েছে। বাজারে যোগান কমে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সেক্টরই ক্ষতির মুখে পড়েছে। এতে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ মানুষের।
যশোর শহরের ঘোপ এলাকার গৃহিণী রাজিয়া সুলতানা বলেন, ‘গ্যাস পাই না, বিদ্যুতে রান্না করতে গিয়ে খরচ বাড়ছে। অতিরিক্ত সারচার্জ, ভ্যাট, ট্যাক্সও গুণতে হচ্ছে। শহরে কাঠ দিয়ে রান্নার পরিবেশ নেই। এতে সময়, কষ্ট আর খরচ সবই বেড়ে গেছে।’
মো. মিজানুর রহমান নামে এক বেসরকারি চাকুরে বলেন, “গ্যাসের দাম আগেই বাড়তি ছিল। তার ওপর এখন সিলিন্ডারই পাওয়া যাচ্ছে না। এমনিতেই সব কিছুর দাম বেশি। জীবন ধারণের খরচ অনেক বেড়েছে। সেখানে গ্যাসের দাম আরো ২/৩শ’ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে। আমরা সাধারণ মানুষ কীভাবে সংসার চালাবো?”
উজ্জ্বল বিশ্বাস নামে এক কর্মজীবী বলেন, ‘‘আমি তিন দিন ঘুরেছি। কোথাও বসুন্ধরার সিলিন্ডার পাইনি। এখন ওমেরার একটি সিলিন্ডার পেয়েছি। সাড়ে ১৬শ’ টাকায় নিয়ে যাচ্ছি। সরকারের উচিত এই বিষয়ে নজর দেওয়া। কারণ, সবাই তাদের আখের গোছালেও মূল্য কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষকেই দিতে হচ্ছে।”
এলপিজি গ্যাস ব্যবহারকারী অ্যাম্বুলেন্স-চালক ডালিম আহমেদ আকাশ জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে দিনে গাড়ি প্রতি সর্বোচ্চ ১০ লিটার গ্যাস দিচ্ছে পাম্পগুলো। এক্ষেত্রেও লিটার প্রতি ৫২ টাকা থেকে সাত টাকা বাড়িয়ে ৫৯ টাকা ধার্য করে দিয়েছে পাম্পগুলো। সাধারণ গাড়ির ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এদিকে রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী ইকরামুল হোসেন বলেন, ‘আমার হোটেলে গড়ে প্রতিদিন পাঁচটি সিলিন্ডার দরকার হয়। সেখানে দিনে মাত্র একটি সিলিন্ডার মিলছে। কোনো কোনো হোটেলে আরো বেশি সিলিন্ডার প্রয়োজন হয়। তারাও একটি করে পাচ্ছে। এতে আমরা বিপাকে পড়েছি। নতুন চুলা বানিয়ে, খড়ি কিনে তা দিয়ে রান্নার কাজ চালাতে হচ্ছে। এতে সময় বেশি লাগছে। গ্রাহকদের সময়মতো খাবার সরবরাহ করা যাচ্ছে না।’
যশোর এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতির দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, সরকার নতুন দাম নির্ধারণ করার পরে বাজারে সংকট আরো বেড়েছে। যশোর জেলায় প্রতি মাসে প্রায় ৫০ হাজার গ্যাস সিলিন্ডারের চাহিদা রয়েছে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে অন্তত এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ ছিল। কিন্তু এখন সেটাও মিলছে না। গত তিন দিনে পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে পড়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, যশোরে সমিতির অধীনেই শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। এছাড়াও বিভিন্ন উপজেলা, বাজার, পাড়া-মহল্লাতেও অনেক খুচরা ব্যবসায়ী রয়েছেন। সব মিলিয়ে যশোরে এলপিজি ব্যবসার সাথে প্রায় পাঁচ হাজার দোকানি-কর্মচারী-সরবরাহকারী রয়েছেন। যাদের আয়ের উৎস এই ব্যবসা। কিন্তু দামের এ নৈরাজ্যের কারণে অনেক দোকানিকেই বিপাকে পড়তে হয়েছে। কেউ কেউ ইতিমধ্যে দোকান বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ দোকান বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো উপায় তাদের সামনে নেই।
দেশের শীর্ষস্থানীয় জ¦ালানি ব্যবসায়ী করিম গ্রুপের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, প্রকৃত সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে জ্বালানি উপদেষ্টা গ্যাস সংকটকে ব্যাবসায়ীদের কারসাজি বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। আর প্রশাসনকে খুচরা বিক্রতাদের পেছনে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে যেটুকু গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল, সেটাও খুচরা পর্যায়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়লো।
তিনি বলেন, এলপিজি ১০০ শতাংশ আমদানিনির্ভর পণ্য; যা তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো থেকে আসে। এখানে যে বিষয়টিকে আড়াল করা হচ্ছে তা হলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞা। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সরাসরি আমাদের দেশের ওপর না পড়লেও পরোক্ষভাবে এর প্রভাব রয়েছে। বর্তমানে এলপিজি পরিবহনকারী জাহাজ আসছে সীমিত। আমাদের দেশের কোম্পানিগুলোর সাথে যেসব জাহাজ (মাদার ভেসেল) এলপিজি পরিবহনে চুক্তিবদ্ধ ছিল, সেগুলো ইরান কিংবা রাশিয়ান গ্যাস তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কিনে বাংলাদেশে আনতো।
তিনি আরো বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইরান, রাশিয়ার পণ্য পরিবহন ও মালিকানায় থাকা জাহাজগুলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় পড়ে। যেকারণে বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো সহজে এলপিজি আমদানি করতে পারছে না। দুই-তিনটি ছাড়া বাকি সব কোম্পানি বর্তমানে বন্ধ। তাদের স্টোরেজে আমদানি করা গ্যাস লিকুইড শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে এই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আর বাকি কোম্পানিগুলোতে যা আছে তা ডিস্ট্রিবিউটররা রেশনিংয়ের মাধ্যমে পাচ্ছে। এভাবে গ্যাস পেতে একটি গাড়িকে কয়েকদিন কোম্পানির প্লান্টে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। এতে পরিবহন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। যার প্রভাব সরাসরি পণ্যের দামে পড়ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.