যশোর প্রতিনিধি
যশোরের মণিরামপুর উপজেলায় কপোতাক্ষ নদের ওপর নিজের টাকায় সেতু বানিয়ে দেওয়ায় প্রশংসায় ভাসছেন প্রবাসী জিয়াউর রহমান। কপোতাক্ষ নদের উপর কাঠ ও বাঁশ দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে সাঁকো তৈরি করে দিয়েছেন তিনি। নৌকায় নদ পারাপারে দুর্ভোগ দূর করতে মণিরামপুর উপজেলার ডুমুরখালি বাজার-সংলগ্ন খেয়াঘাটে ওই যুবক পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩০০ ফুট দৈর্ঘ্যের সাঁকোটি নির্মাণ করে দিয়েছেন।
স্বল্পশিক্ষিত প্রবাসী জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে নির্মিত সাঁকোটি মণিরামপুর ও ঝিকরগাছা দুই উপজেলার সংযোগ স্থাপন করেছেন। যোগাযোগে দূরত্ব কমিয়েছে ৫-৬ কিলোমিটার। চলাচলের জন্য আগামী বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) আনুষ্ঠানিকভাবে এটি খুলে দেওয়া হবে।
কপোতাক্ষ নদের একপাশে মণিরামপুরের ডুমুরখালী বাজার, অপরপাশে ঝিকরগাছার উজ্জ্বলপুর গ্রাম। এছাড়াও নদের ওপারে রয়েছে ডুমুরখালী গ্রামের মানুষের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ও মাছের ঘের। কিন্তু এই দুই গ্রামের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে দীর্ঘদিন ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে এলাকাবাসীকে।
নদের দুই পাড়ের মানুষের পারাপারের একমাত্র মাধ্যম ছিল ছোট নৌকা। বর্ষা মৌসুমে স্রোত বেড়ে গেলে অথবা রাতে জরুরি প্রয়োজনে এই নৌকা পারাপার হয়ে উঠতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক সময় স্কুলগামী শিক্ষার্থী, অসুস্থ রোগী কিংবা কৃষকরা ঝুঁকিতে পড়তেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নৌকা পারাপারের সময় বহু দুর্ঘটনা ঘটেছে। অনেক শিক্ষার্থী নৌকা থেকে পড়ে বইখাতাসহ ভিজে গেছে। নৌকায় ঝুঁকি এড়াতে ওপার থেকে ডুমুরখালী বাজারে আসতে পথচারীদের ঝাঁপা বাজার অথবা বাঁকড়া বাজার ঘুরে দীর্ঘপথ অতিক্রম করতে হতো; যা ছিল কষ্টের।
উদ্যোক্তা জিয়াউর রহমান বলেন, ‘ডুমুরখালীতে তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও একটি বাজার রয়েছে। এগুলোর কথা ভেবেই সেতুটি করা। নদের ওপারের মানুষজন এপারে আসতে তাদর খুব কষ্ট হয়। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে নদ কানায় কানায় ভরে যায়। নৌকা পার হতে তখন খুব সমস্যা। আমি কয়েকবার নৌকা ডুবে যেতে দেখেছি। নৌকা ডুবে বাচ্চাদের বইখাতা ভিজে যেত। সেতু হওয়ায় উজ্জ্বলপুর, বালিয়াডাঙ্গা, খোশালনগর, ডুমুরখালী, রুপসপুর, তাজপুর ও দশআনিকোলা গ্রামের মানুষের নদ পারাপারে সহজ হবে।’
‘অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছি। ১৯ বছর ধরে মালয়েশিয়ায় আছি। ছুটিতে বাড়ি এসে মানুষের কষ্ট দেখে এখানে একটা সেতুর জন্য একাধিকবার স্থানীয় এমপি, সাবেক সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্যের কাছে গিয়েছি। তিনি সাড়া না দেওয়ায় নিজের টাকায় সাঁকো তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছি।’
‘‘পাঁচমাস আগে মালয়েশিয়ায় থাকতে সাঁকো করার উদ্যোগ নিই। তখন উজ্জ্বলপুরের লোকজন বাধা দেয়। পরে আবার তারা অনুমতি দিলে কাজ শুরু করা হয়। প্রায় তিনশ’ ফুট দৈর্ঘ্য ও ছয় ফুট চওড়া সাঁকোটি করতে চারশ’ বাঁশ ও ২৬০ সিএফটি কাঠ ও লোহার পেরেক ব্যবহার করা হয়েছে। শ্রমিকরা ২৮ দিন কাজ করেছে। প্রথম ১২ দিন ১০ জন করে আর পরের কয়দিন চারজন করে শ্রমিক কাজ করেছেন। একপাশের রেলিংয়ের কাজ বাকি আছে। এটা শেষ হলে রং টেনে বৃহস্পতিবার সাঁকো উদ্বোধন করবো,” বলেন জিয়াউর।
স্থানীয়রা বলছেন, ডুমুরখালী গ্রামের প্রবাসী যুবক জিয়াউর রহমানের নিজ অর্থায়নে কপোতাক্ষের উপর তৈরি হওয়া সাঁকোটি দুই উপজেলাকে যুক্ত করেছে। এখন সড়কপথে দুই গ্রামের যাতায়াতে তিন থেকে চার কিলোমিটারের রাস্তা কমেছে। এই সেতুটি হওয়ায় এলাকাবাসীর যাতায়াত ব্যবস্থা আরো উন্নত হবে। শিক্ষার্থীরা সঠিক সময়ে স্কুলে পৌঁছাতে পারবে। অসুস্থ রোগীরা দ্রুত সেবা নিতে পারবে।
ঝিকরগাছা উপজেলার উজ্জ্বলপুর গ্রামের রেখা বেগম বলেন, ‘আমাদের ডুমুরখালী আসতে হয় বাজারঘাট করতে। এই পথে নদ পার হয়ে বাঁকড়া বাজারে যেতে সহজ। আগে ডিঙি নৌকায় পার হতে মাঝিকে বছরে দেড়মণ ধান দিতাম। এখন সাঁকো পার খুব সহজ হবে।’
ডুমুরখালী এলাকার কওসার আলী বলেন, ‘উজ্জ্বলপুর গ্রামে মেয়ে বিয়ে দেওয়া। আগে চার থেকে পাঁচ মাইল ঘুরে বাঁকড়া হয়ে মেয়ের বাড়ি যেতে হতো। এখন সাঁকো হওয়ায় সহজেই মেয়ে-জামাইয়ের বাড়ি যাওয়া যাবে।’
জিয়াউর রহমান আরও বলেন, ‘সাঁকো পারাপারে কোনো টাকা নেওয়া হবে না। সাইকেল ও মোটরসাইকেলের পাশাপাশি এই সাঁকোর ওপর দিয়ে ভ্যান ও ইজিবাইক পারাপার হতে পারবে। নতুন সাঁকো ৪-৫ বছরে কিছু হবে না। এরপর যেখানে নষ্ট হবে, নিজ খরচে তা মেরামত করে দেবো।’
জিয়াউর রহমান এরআগে ডুমুরখালী বাজার ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার আওতায় এনেছেন। স্থানীয় মাদরাসার দাতা সদস্য জিয়াউর শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পোশাক দিয়েছেন। একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভবন ও গেট নির্মাণ করে দিয়েছেন।
‘এলাকায় ১৬ শতক জমির উপর পাঁচতলা ভবনের একটা হাসপাতালের কাজ শুরু করেছি। এলাকার মানুষ কম খরচে এখানে সব সেবা পাবেন,’ বলেন জিয়া।
হরিহরনগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ডুমুরখালী বাজার-সংলগ্ন খেয়াঘাট দিয়ে নদের ওপারের বহু মানুষ এপাশে মণিরামপুর অংশে আসে। কাঠ ও বাঁশের সাঁকো তৈরি করে দিয়ে জিয়া মহৎ কাজ করেছেন। এখানে একটা কংক্রিটের সেতু দরকার। উপজেলা পরিষদের আগামী সভায় বিষয়টি উত্থাপন করা হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.