বাঁধন হোসেন, জামালপুর প্রতিনিধি
জামালপুর জেলার প্রায় ৩শ বছর পুরনো ঐতিহ্যবাহী রানীগঞ্জ হাট এক সময় জেলার সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক হাট হিসেবে পরিচিত ছিল। সময়ের ব্যবধানে অবহেলা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে হাটটি হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলেও সাম্প্রতিক উন্নয়ন কার্যক্রমে আবারও প্রাণ ফিরে পাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী হাট। তারই ধারাবাহিকতায় বিলুপ্তির পথ থেকে ফিরে আসছে রানীগঞ্জ হাটের মূল আকর্ষণ—শুটকির বাজার। হাটের ব্যবসায়ীদের আশা, অচিরেই বাজারটি আগের জৌলুস ফিরে পাবে।
এক সময় জামালপুর শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত বংশ নদী ছিল এই অঞ্চলের প্রধান নৌ-বাণিজ্য পথ। শত বছর আগে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিশাল সাম্পান নৌকা ও জাহাজে করে ব্যবসায়ীরা পণ্য নিয়ে আসতেন রানীগঞ্জ হাটে। শুধু দেশীয় নয়, ভিনদেশি ব্যবসায়ীরাও এই নৌপথ ব্যবহার করতেন। ধীরে ধীরে নদীকেন্দ্রিক এই বাণিজ্যকে ঘিরেই গড়ে ওঠে রানীগঞ্জ হাট।
ভূমি জরিপ সিএস সূত্রে জানা যায়, অবিভক্ত ভারতের সময় নাটোরের রানী দেবী চৌধুরানীর সাম্রাজ্যের অংশ ছিল এই এলাকা। তাঁর নামানুসারেই প্রায় ১০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় রানীগঞ্জ হাট। সে সময় জামালপুর ছাড়াও ময়মনসিংহ, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সমাগম ঘটত এখানে। ধান, পাট, চাল, গম, সরিষা, ডাল, পেঁয়াজ, রসুন ও মসলাসহ শত শত মণ পণ্যবোঝাই নৌযানের ভিড় লেগে থাকত হাটজুড়ে।
তবে রানীগঞ্জ হাটের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও পরিচিত পণ্য ছিল শুটকি। শুটকির বাজারের জন্যই এই হাট আলাদা খ্যাতি অর্জন করে। শুরু থেকেই শনিবার ও মঙ্গলবার অন্যান্য পণ্যের হাট বসলেও শুটকির বাজার বসত প্রতিদিনই। বর্তমানে বাজারে কেজিপ্রতি ২২০০ টাকা দামের চিংড়ি শুটকি থেকে শুরু করে ২০০ টাকার জাটকি শুটকিসহ নানা ধরনের শুটকি পাওয়া যাচ্ছে।
প্রতি সোমবার দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম থেকে নুনা ইলিশ, ফেপি, চিংড়ি, কর্তি, মলা, লইট্টা, ছুরি, চেলা, ইচা, চৌটকি, কলম্বসহ দেশি-বিদেশি প্রায় ৫০ প্রকারের শুটকি আসে এই বাজারে। বর্তমানে বাজারে প্রায় ৩৮টি দোকানে এসব শুটকি বিক্রি হচ্ছে।
তবে মাঝখানে দীর্ঘ সময় এই বাজার ভালো সময় দেখেনি। দোকান কমে যাওয়া, অনলাইনে শুটকি কেনাবেচা এবং মানহীন পণ্য সরবরাহের কারণে ক্রেতা কমে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে বাজারের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও অনলাইনে নিম্নমানের পণ্যের অভিজ্ঞতায় আবারও ক্রেতারা সরাসরি বাজারমুখী হচ্ছেন। এতে কিছুটা হলেও লাভের মুখ দেখছেন ব্যবসায়ীরা।
শুটকি ব্যবসায়ী রাশেদ বলেন, “এখানে সব ব্যবসায়ীই মাঝারি পর্যায়ের। প্রতি সোমবার চট্টগ্রাম থেকে শুটকি আসে। মাসে প্রতি দোকানে গড়ে দেড় লাখ টাকার শুটকি নামে। সব মিলিয়ে প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকার শুটকি কেনাবেচা হয়। তবে ১০ বছর আগে এর চেয়েও বেশি ছিল। আগে আশপাশের উপজেলা থেকে পাইকাররা আসতেন, এখন তারা সরাসরি চট্টগ্রাম থেকে শুটকি নিয়ে যান।”
আরেক ব্যবসায়ী মো. মুরাদ বলেন, “আগে এখানে দোকান ছিল ২০টি, এখন ৩৮টি। মানুষ আগের মতো শুটকি খায় না। দোকান বেড়েছে, কিন্তু ক্রেতা সে অনুযায়ী বাড়েনি।”
ব্যবসায়ী নাশেব জানান, “এই বাজারে বাপ-দাদারা ব্যবসা করতেন। এখানে বিশ্বাসের ওপর বাকি ব্যবসা চলে। কিন্তু এখন অনেক পাইকার টাকা পরিশোধ না করেই হারিয়ে গেছে। আমার চাচার প্রায় এক কোটি টাকা বাকি পড়ে আছে। এতে তিনি ব্যবসা ছেড়ে পথে বসেছেন।”
তবে ব্যবসায়ী মনু কিছুটা আশাবাদী। তিনি বলেন, “আগের তুলনায় বেচাকেনা কিছুটা বেড়েছে। নতুন পাকা দোকান হলে আরও ব্যবসায়ী আসবেন, বাজার বড় হবে। বাজার বড় হলে ক্রেতাও বাড়বে।”
জেলার সমাজচিন্তাবিদরা মনে করছেন, রানীগঞ্জ বাজার প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে থাকলেও নতুন স্থায়ী দোকান নির্মাণের ফলে সেই শঙ্কা অনেকটাই কেটে গেছে। তবে তারা আশা প্রকাশ করেন, নতুন দোকানগুলো যেন ভাড়া বাণিজ্যের শিকার না হয় এবং প্রকৃত ব্যবসায়ীরাই যেন দোকান বরাদ্দ পান।
এ বিষয়ে জামালপুর পৌর প্রশাসক এ কে এম আবদুল্লাহ বিন রশিদ বলেন, “রানীগঞ্জ বাজারে নতুন পাকা দোকান নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। অধিকাংশ কাজ শেষ হয়েছে। দোকানগুলো যেন বাজারের প্রকৃত ব্যবসায়ীরাই ভাড়া পান, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ নজর দেওয়া হবে।”
ঐতিহ্য, ইতিহাস ও জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জামালপুরের রানীগঞ্জ শুটকির বাজার আবারও প্রাণ ফিরে পেলে তা শুধু ব্যবসায়ীদের নয়, পুরো জেলার অর্থনীতি ও সংস্কৃতির জন্যই হবে ইতিবাচক।

