রাসেল আহমেদ, খুলনা প্রতিনিধি
চিত্রা নদীর ওপর নির্মিত আধুনিক ব্রিজটি চার বছর ধরে এলাকার মানুষের জন্য প্রতীক্ষিত। নির্মাণ কাজ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শেষ হলেও, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দাঁড়িয়েও সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য এটি খুলে দেওয়া যায়নি। কারণ—সেতুর দুই পাড়ে সংযোগ সড়ক নেই। জমি অধিগ্রহণের জটিলতা পুরো প্রকল্পকে থমকে রেখেছে।
কাটেঙ্গা বাজার ও তেরখাদা বাজার সংযোগকারী এই সেতু তৈরি করার সময় স্থানীয়রা আশাবাদী ছিলেন, মনে করেছিলেন দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান হবে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হবে। নদীর দুই তীর বরাবর দীর্ঘদিন ধরে ঝুলন্ত ব্রিজে মানুষ চলাচল করতেন। স্কুলগামী শিশু, রোগী, ব্যবসায়ী, কৃষক—সবাই ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করতেন।
নতুন সেতু নির্মাণ শেষে পরিস্থিতি বদলেনি। সংযোগ সড়ক তৈরি করতে প্রয়োজন সরকারি জমি উদ্ধার, কিন্তু ব্রিজ সংলগ্ন অনেক দোকান এবং বাণিজ্যিক স্থাপনা এখন সেই কাজকে জটিল করে তুলেছে। ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে পৈত্রিক সূত্রে বা ক্রয়কৃত মালিকানায় এই দোকানগুলো ব্যবহার করছেন।
অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবে এসব জমি খাস হিসেবে দেখানো হয়েছিল, যা তাদের জন্য উদ্বেগের কারণ।
কাটেঙ্গা বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ব্রিজের ঘেঁষে রয়েছে বাবু মোল্লার মুদি দোকান, ইউছুপ চৌহদ্দির হোটেল এবং সৌদি প্রবাসী সাইফুজ্জামানের দোকান। সাইফুজ্জামান জানান, তিনি ১৬ লাখ টাকা দিয়ে দোকানটি কিনেছেন।
জনপ্রিয় কসমেটিক্সের মালিক ইমদাদুল ইসলাম টনি বলেন, “বাজার বাঁচিয়ে যদি সংযোগ সড়ক করা হয়, তাহলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু বাজার ভেঙে রাস্তা করলে আমরা সর্বস্ব হারাব।”
তিনি আরও বলেন, বাজারের পূর্ব পাশে মসজিদের মেহরাবের নিচতলার ব্যক্তিমালিকানাধীন দোকানগুলো ভেঙে দিলে সংযোগ সড়ক করা সম্ভব হবে এবং অনেক ব্যবসায়ী রক্ষা পাবে।
কাটেঙ্গা বাজারের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হেদায়েতুল্লাহ বলেন, “আমাদের প্রতিটি দোকানের সঙ্গে তিনটি পরিবার জড়িত। উন্নয়নের বিপক্ষে আমরা নই, কিন্তু উন্নয়নের নামে যেন আমাদের জীবন ধ্বংস না করা হয়।”
তেরখাদা বাজারেও পরিস্থিতি সংকটাপন্ন। সংযোগ সড়ক না থাকায় ব্রিজ ব্যবহার অচল। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রায় শতাধিক দোকান ভেঙে পড়বে। এতে পুরো বাজার ধ্বংস হওয়ার শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
ভাই ভাই রাইস মিল ও ভাই ভাই ফার্মেসির মালিক আকাশ কুমার সাহা বলেন, “এটা আমাদের ১৯৬২ সালের সম্পত্তি। সড়ক বিভাগ যে জায়গা নিশানা করেছে, তাতে পুরো বাজার ধ্বংস হয়ে যাবে। বিষয়টি আমরা খুলনার জেলা প্রশাসককে জানিয়েছি। তিনি ব্যবসায়ীদের কথা বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন।”
তিনি আরও জানান, পুরোনো ব্রিজ সংলগ্ন সড়ক বরাবর নতুন সংযোগ সড়ক না হলে তারা আন্দোলনে নামবেন।
ভাই ভাই ট্রেডার্সের মালিক বিধান সাহা বলেন, “পুরোনো রাস্তা ব্যবহার করলে মাত্র কয়েকটি দোকান ভাঙতে হবে। কিন্তু বর্তমান পরিকল্পনায় শতাধিক দোকান ভাঙতে হবে। প্রশাসনের কাছে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান করছি।”
এ বিষয়ে খুলনা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী তানিমুল হক জানান, “ব্রিজের অ্যাপ্রোচ রোড নির্মাণের জন্য দুই পাড়ের জমি অধিগ্রহণের সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি বিধি অনুযায়ী জমি উদ্ধার করা হবে। যেহেতু তারা সরকারি জায়গা দখল করে ব্যবসা করছে, তাই ছাড় দিতে হবে।”
তিনি আরও জানান, ব্রিজটি বাঁকা হওয়ায় দুর্ঘটনা রোধে এবং সৌন্দর্য বজায় রাখতে সংযোগ সড়ক আর্কিটেকচারের নিয়ম মেনে তৈরি করা হবে।
চার বছর ধরে অপেক্ষায় থাকা তেরখাদাবাসীর প্রশ্ন একটাই—উন্নয়নের নামে কেন তাদের জীবিকা কেড়ে নেওয়া হবে? বিকল্প পথ থাকা সত্ত্বেও কেন বাজার ধ্বংসের পরিকল্পনা?
এলাকা জুড়ে মানুষ এখন মানবিক সমাধানের প্রত্যাশায় অপেক্ষায়—স্বপ্নের সেতু যেন অবশেষে চালু হয়, কিন্তু কোনো পরিবারকে বিপদে ফেলবে না এমন দৃষ্টিকোণ বজায় রেখে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.