রাসেল আহমেদ,খুলনা প্রতিনিধি
সুন্দরবন—বাংলাদেশে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের শেষ আশ্রয়স্থল। যেখানে নীরবতা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যই বাঘসহ অসংখ্য বন্য প্রাণীর নিরাপত্তার প্রধান শর্ত। অথচ সেই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরেই প্যান্ডেল, জেনারেটর ও সাউন্ডবক্স স্থাপন করে সচেতনতামূলক সভার আয়োজন করেছে বন বিভাগ—যা নিয়ে পরিবেশবাদী ও স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সকাল ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত পশ্চিম সুন্দরবনের বজবজা টহল ফাঁড়ি এলাকায় এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানস্থলটি ঝপঝোপিয়া ও শাকবাড়িয়া নদীর মোহনায় অবস্থিত। সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের সহযোগিতায় এবং পশ্চিম বন বিভাগের খুলনা রেঞ্জের আয়োজনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. শরিফুল ইসলামের সভাপতিত্বে আয়োজিত সভায় উপস্থিত ছিলেন কয়রা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সমীর কুমার সরকার, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ, কয়রা কপোতাক্ষ কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. ওলিউল্যাহসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সভায় সাংবাদিক, ভিটিআরটি ও কমিউনিটি পেট্রোলিং গ্রুপের (সিপিজি) সদস্যদের পাশাপাশি সুন্দরবননির্ভর জেলে ও বাওয়ালিরাও অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের একাধিক সূত্র জানায়, বন বিভাগের ব্যবস্থাপনায় ট্রলারে করে নদীপথে অংশগ্রহণকারীদের সুন্দরবনের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। পাশাপাশি জেলে ও বাওয়ালিরা নিজ নিজ নৌকায় করেও সভায় যোগ দেন। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের জন্য দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হয় এবং গেঞ্জি ও ক্যাপ বিতরণ করা হয়।
তবে বাঘ সংরক্ষণের নামে বাঘের আবাসস্থলে মানুষের ভিড়, উচ্চ শব্দের সাউন্ডবক্স, জেনারেটরের কম্পন ও যান্ত্রিক আলোর ব্যবহার পরিবেশ সচেতন মহল ভালোভাবে নিতে পারেননি। জলবায়ু সচেতনতা ও সুন্দরবন উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন,“সুন্দরবনে মানুষের ভিড়, সাউন্ডবক্সের শব্দ, জেনারেটরের কম্পন ও আলো বন্য প্রাণীর স্বাভাবিক চলাচলে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায়। সচেতনতার উদ্দেশ্য ভালো হলেও স্থান ও আয়োজনের ধরনে আরও সংযমী হওয়া প্রয়োজন ছিল। বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের অর্থ ব্যয় করে বাঘের আবাসে এমন আয়োজন অনভিপ্রেত।”
পরিবেশবাদীরা আরও অভিযোগ করেন, পশ্চিম সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা অনুমোদনহীন রিসোর্টগুলোতেও নিয়মিত উচ্চস্বরে সাউন্ডবক্সে গান বাজানো হয়, যা দীর্ঘদিন ধরেই বন্য প্রাণীর জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে বজবজা টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাকিব তালুকদার বলেন,“প্রথমে অনুষ্ঠানটি লোকালয়ের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশন এলাকায় করার পরিকল্পনা ছিল। তবে টহল ফাঁড়িটি মাঝামাঝি অবস্থানে হওয়ায় স্থান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অনুষ্ঠানটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্যান্ডেল ও সাউন্ডবক্সের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।”
অন্যদিকে খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. শরিফুল ইসলাম বলেন,“অনুষ্ঠানটি সীমিত পরিসরে, মূলত জেলে ও বাওয়ালিদের নিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল। জাতীয় নির্বাচনের আগমুহূর্তে লোকালয়ে অনুষ্ঠান করলে বিভিন্ন প্রভাব পড়তে পারে—সেই বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।”
তবে আয়োজকদের এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের পরিচালক ও সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান। তিনি বলেন,“সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান লোকালয়েই হওয়া যুক্তিযুক্ত। বজবজা টহল ফাঁড়ি সুন্দরবনের ভেতরে অবস্থিত—সেখানে এ ধরনের আয়োজন ঠিক হয়নি। বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে যাতে সুন্দরবনের ভেতরে এমন আয়োজন না হয়, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হবে।”
বাঘ সংরক্ষণের নামে বাঘের আবাসস্থলে এ ধরনের আয়োজন কতটা যৌক্তিক—সে প্রশ্ন এখন স্থানীয় মানুষ থেকে শুরু করে পরিবেশবিদদের কণ্ঠে। সচেতনতা প্রয়োজন, তবে সেই সচেতনতা যদি প্রকৃতির নীরবতাকেই ভেঙে দেয়, তাহলে তার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই—এমন মতই দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.