
রাসেল আহমেদ,খুলনা প্রতিনিধি
খুলনা নগরীর শিববাড়ি মোড় একসময় পরিচিত ছিল একটি মিলনায়তনের নামে। নব্বইয়ের দশকে নির্মিত ‘জিয়া হল’ দীর্ঘ সময় ধরে সভা-সমাবেশ, নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র ছিল।
তবে রাজনৈতিক বিতর্ক, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও অব্যবহারের ধারাবাহিকতায় স্থাপনাটি শেষ পর্যন্ত ভেঙে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে ওই স্থানে আধুনিক ‘সিটি সেন্টার’ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)। এ সিদ্ধান্তকে ঘিরে নগরীতে মতভেদ দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৭৮ সালের ১২ জানুয়ারি হল নির্মাণের জন্য জমি হস্তান্তর করা হয় এবং ১৯৭৯ সালে এক দশমিক ৭২১৭ একর জমির ওপর নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে পাইলিং সম্পন্ন হলেও ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
প্রায় আট বছর পর ১৯৮৯ সালে আবার নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১৯৯১ সালে কেসিসির মেয়র তৈয়েবুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর মূল সুপার স্ট্রাকচারের কাজ এগোয়। ১৯৯২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মিলনায়তনটির উদ্বোধন করেন। তখন এর নাম রাখা হয় ‘জিয়া হল’।
দ্বিতল গ্যালারিবিশিষ্ট মিলনায়তনে এক হাজার ৬৫টি আসন ছিল। পাশাপাশি ১৯০ আসনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সেমিনার কক্ষ, দুটি লাউঞ্জ, মহড়া কক্ষ, বিশ্রাম কক্ষ, লেডিস কর্নার, নামাজঘর ও প্রশাসনিক অফিসসহ বিভিন্ন সুবিধা যুক্ত ছিল। দীর্ঘ সময় এটি খুলনার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
১৯৯৬ সালে সরকার পরিবর্তনের পর হলটির নাম নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। সরকারি অনুষ্ঠানে ‘পাবলিক হল’ নাম ব্যবহার করা হয় এবং এক পর্যায়ে নামফলক অপসারণের ঘটনাও ঘটে। পরে তা পুনঃস্থাপন করা হলেও নামকরণ ইস্যুতে আলোচনা অব্যাহত থাকে।
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সংস্কারের জন্য বরাদ্দের নির্দেশ দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
২০০৮ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর নতুন প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানে ‘সিটি সেন্টার’ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সে সময় মেয়র ছিলেন তালুকদার আব্দুল খালেক। ধীরে ধীরে হলটির ব্যবহার কমে আসে; ২০১১ সাল থেকে মূল মিলনায়তন এবং ২০১২ সাল থেকে পুরো কমপ্লেক্স বন্ধ হয়ে যায়।
পরবর্তীতে ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৯ সালে ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে কনডেমড ঘোষণা করা হয়। একই বছর নিলামের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কয়েক দফা আহ্বানের পরও সাড়া মেলেনি।
২০২১ সালের ২৩ ডিসেম্বর একটি প্রতিষ্ঠানের আবেদন অনুমোদনের পর ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়।
কেসিসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘জিয়া হল’ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের শিকার হয়েছে। তার ভাষ্য, ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করতে বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। তবে তিনি দাবি করেন, খুলনা লবণাক্ত এলাকা হলেও বহু পুরোনো ভবন এখনো টিকে আছে।
নগরীর ময়লাপোতার বাসিন্দা মাসুদ চৌধুরি বলেন, ছোটবেলায় তারা নিয়মিত জিয়া হলে যেতেন। “২০০৩-০৪ সালেও সেখানে নানা সভা-সমাবেশ হতো। জিয়া হল ছিল খুলনাবাসীর আবেগের জায়গা। বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এলাকাটি অনেকটাই প্রাণহীন হয়ে পড়ে,” বলেন তিনি। একই নকশায় পুনর্নির্মাণ হলে তা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে বলেও মত দেন মাসুদ।
শেখপাড়া এলাকার বাসিন্দা হাবিব সরদার বলেন, কলেজজীবনে জিয়া হল চত্বরে আড্ডা দেওয়ার স্মৃতি এখনো স্পষ্ট। তার ভাষায়, “সংস্কার করে ভবনটি রক্ষা করা যেত। সরকার চাইলে ঐতিহ্য সংরক্ষণ সম্ভব ছিল।”
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, নব্বইয়ের দশকের নান্দনিক স্থাপনা হিসেবে জিয়া হল ছিল সুপরিচিত।
নাম পরিবর্তন ও পরিত্যক্ত ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমরা একই নকশায় পুনর্নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি,” বলেন তিনি।
এদিকে কেসিসির প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবির উল জব্বার বলেন, ভবনটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ায় কনডেমড ঘোষণা করা হয়। “ওই স্থানে আধুনিক সিটি সেন্টার নির্মাণের জন্য প্রায় ৪১৮ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প প্রস্তাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে,” জানান তিনি।
একসময় যে মিলনায়তনকে ঘিরে মুখর থাকত শিববাড়ি মোড়, এখন সেখানে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। উন্নয়ন ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রশ্নে ‘জিয়া হল’ তাই খুলনায় এখনও আলোচনার।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.