আবু সাঈদ দেওয়ান সৌরভ, মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি
ঘুষ ও অনিয়ম এবং মিজান সিন্ডিকেটে চলছে সিভিল সার্জন কার্যালয়। মুন্সীগঞ্জ সিভিল সার্জন অফিসের অলিখিত পরিচালক স্টেনোটাইপিস্ট মো: মিজানুর রহমান। প্রায় ৩৫ বছর মুন্সীগঞ্জ সিভিল সার্জন অফিস তার অনিয়ম ও ঘুষ বানিজ্যের সিন্ডিকেটে বন্দী।
সরকারের সকল নিয়ম নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে চাকরি করছেন তিনি। ৩৫ বছরে কয়েকবার বদলি হলেও বদলি আদেশের বিরুদ্ধে রিট আর উপর মহলকে ম্যানেজ করে বহাল তবিয়তে মুন্সীগঞ্জ সিভিল সার্জন অফিসে চাকরি করছেন তিনি। সিভিল সার্জন অফিসের প্রায় সকল ক্ষমতাই তার তালুবন্দি।
শুধু তাই নয়, জেলার সকল ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক গুলোর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের লাইসেন্স ও নবায়নে মালিকদের খরচ করতে হয় ৫০ হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা। মুন্সীগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেতে লাগে তার গ্রিন সিগনাল। তিনি গ্রিন সিগনাল দিলেই কেবলমাত্র পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পাওয়া যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিভিল সার্জন অফিসের কর্মচারী ও জেলার কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিকের তথ্যের বরাতে জানা যায়, জেলার প্রায় ৯০ শতাংশ ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়ন করা নেই।
স্টেনোটাইপিস্ট মো: মিজানুর রহমানের সাথে নিদ্রিষ্ট টাকায় চুক্তিবদ্ধ হলে লাগে না কোন নবায়ন। তার সাথে মাসিক চাঁদায় চুক্তিবদ্ধ থাকলে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অভিযানের আগেই তিনি চুক্তিবদ্ধ মালিকদের সর্তক করে দেন। নতুন কোন ডায়াগনস্টিক সেন্টার কিংবা ক্লিনিক গড়ে ওঠলে মোটা অংকের টাকা দিয়ে চুক্তিকরে লাইসেন্স নিতে হয়। ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের নবায়ন কিংবা নতুন লাইসেন্সের সকল কিছুর নিয়ন্ত্রণ করেন স্টেনোটাইপিস্ট মো: মিজানুর রহমান।
সিভিল সার্জন অফিসের তথ্য সুত্রে জানা যায়,
মো. মিজানুর রহমান মুন্সীগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ে ১৯৮৮ সালের দিকে স্টেনোটাইপিস্ট পদে যোগদান করেন। তিনি ১৯৯৯ সালের দিকে ঢাকায় বদলি হন এবং অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে ২০০১ সালে আবার মুন্সীগঞ্জে যোগদান করেন। কয়েক বছর পর তাকে বরিশাল বিভাগের পিরোজপুরে বদলি করা হলেও তিনি হাইকোর্টে রিট করে এখানেই থেকে যান।
সর্বশেষ বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ৩ ডিসেম্বর বিঃপরিঃ (স্বাঃ)/ঢাকা/প্রশা/২০২৫/১৪০৫/১ (১০) স্মারকে মুন্সীগঞ্জ সিভিল সার্জন অফিস থেকে মাদারীপুর সিভিল সার্জন অফিসে একই পদে বদলির এই আদেশ জারি করা হয়। এই বদলি আদেশে তাকে ৫ কর্মদিবসের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে ছাড়পত্র গ্রহণ করে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে বলা হয়। অন্যথায় ৬ষ্ঠ কর্মদিবস থেকে তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অব্যাহতি প্রাপ্ত বলে গণ্য করা হবে বলেও বদলি আদেশে উল্লেখ্য করা হয়। মুন্সীগঞ্জ সিভিল সার্জন অফিস থেকে তাকে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের জন্য ছাড়পত্রও দেওয়া হয়।কিন্তু এবারও তিনি হাইকোর্টের রিট করে মুন্সীগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ে একই পদে থেকে যান।
এছাড়াও মিজানুর রহমানের বেশ কয়েকজন আত্মীয়-স্বজন জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত রয়েছেন। সর্বশেষ মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স চালক জসিম ও মনিরের বিরুদ্ধে অ্যাম্বুলেন্স বাণিজ্য নিয়ে গত বছরের ডিসেম্বরে প্রতিবেদন করে দৈনিক ভোরের কাগজ। সেই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করে তাদের দুজনকে বদলি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সেখানেও তারা বদলি ঠেকাতে সিভিল সার্জন অফিসের স্টেনোটাইপিস্ট মিজানুর রহমানের পরামর্শে হাইকোর্টে রিট করে জেনারেল হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালক পদে পুনরায় যোগদান করেন।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, স্টেনোটাইপিস্ট মিজানুর রহমান ২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে সৌদি আরব যান ওমরাহ পালন করার জন্য। ওমরাহ করে দেশে ফেরার সময় এ অফিসের স্টেনোটাইপিস্ট মিজানুর রহমানকে ইমিগ্রেশন সৌদি পুলিশ আটক করে। অবৈধভাবে স্বর্ণ ও সৌদি রিয়াল আনতে গিয়ে প্রায় দুমাস সৌদি কারাগারে থাকেন তিনি। ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে দুই মাসেও অফিসে যোগদান করতে পারেননি তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক জানান, আমি দীর্ঘ দিন আমাদের পরিবেশ অধিদপ্তর ও সিভিল সার্জন অফিসের লাইসেন্স নবায়নের জন্য ঘুরেছি। কোন কাজ না হওয়ায় পরে মিজান সাহেবের সাথে ৮০ হাজার টাকায় চুক্তি করে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের লাইসেন্স নবায়ন করি। এরপর পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র পেতে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা দিতে হয়।
তবে এসব বিষয়ে বারবার চেষ্টা করেও স্টেনোটাইপিস্ট মো: মিজানুর রহমান বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সিভিল সার্জন ডাঃ কামরুল জমাদ্দারকে মিজানুর রহমানের একটি ঘুষ গ্রহণের ভিডিও ফুটেজ দেখালে তিনি ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং তিনি বলেন, আমি ভিডিও দেখলাম খোঁজ খবর নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহন করবো।
স্থানীয় সচেতন মহল জানায়, নির্দিষ্ট সময় পর বদলির নিয়ম থাকলেও সেখানে ৩৫ বছর ধরে একই কর্মস্থলে থাকা স্পষ্ট সরকারি চাকরি বিধির বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। রিটের মাধ্যমে দীর্ঘসময় একই জায়গায় থাকা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ব্যাহত করছে।
মুন্সীগঞ্জের স্বাস্থ্য বিভাগের সকল অনিয়ম দূরীভূত হবে এবং মুন্সীগঞ্জ সমগ্র বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগের মডেল হিসেবে গড়ে ওঠবে এমনটাই প্রত্যাশা।

