রাসেল আহমেদ,খুলনা প্রতিনিধি
খুলনা বিভাগজুড়ে আবারও হামের প্রাদুর্ভাব বাড়তে শুরু করেছে। গত কয়েকদিনে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে স্বাস্থ্যখাতে। ইতোমধ্যে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ তিন শিশু গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় আইসোলেশন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছে। একই সঙ্গে বিভাগের ১০ জেলায় মোট ৭৮ জন শিশু বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আইসোলেশনে থাকা তিন শিশুর বয়স ৫, ৭ ও ৮ মাস। তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ায় অবস্থা সংকটাপন্ন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. সৈয়দা রুখশানা পারভীন বলেন, “হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত শিশু হাঁচি-কাশির মাধ্যমে খুব সহজেই অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু নিয়মিত টিকা পায়নি বা অপুষ্টিতে ভুগছে, তাদের ঝুঁকি অনেক বেশি।”
তিনি আরও বলেন, “সাধারণত সংক্রামক রোগের রোগীদের আমাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয় না। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় একটি আইসোলেশন ইউনিট চালু করেছি। সেখানে তিনটি শিশুকে রাখা হয়েছে এবং তাদের অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। এখন জরুরি ভিত্তিতে ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন।”
খুলনা বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে কুষ্টিয়ায়।
কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে ১৩ জন এবং কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসোলেশনে আরও ৫০ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। এছাড়া যশোরে ৬ জন এবং সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ ও মাগুরায় ২ জন করে শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে।
চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের বড় অংশই নবজাতক থেকে ৫ বছর বয়সী শিশু। তাদের মধ্যে জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ার মতো জটিলতাও দেখা দিচ্ছে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগ সূত্র জানায়, গত এক সপ্তাহে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় আক্রান্তদের আলাদা ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার দে বলেন, “হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাল রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে গড়ে অন্তত ১৮ জন সংক্রমিত হতে পারে। ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে এর লক্ষণ প্রকাশ পায়।”
তিনি আরও বলেন, “প্রথম দিকে জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া ও আলো সহ্য করতে না পারার মতো উপসর্গ দেখা যায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে, যা শিশুর জন্য জীবনঝুঁকির কারণ হতে পারে।”
এদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে নয় মাস বয়সের আগেই শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ। ফলে টিকাদানের সময়সীমা এগিয়ে আনার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, “মিজেলস বা হামের রোগী সম্প্রতি বেড়েছে। গত ১৫ দিনে এর প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের সক্ষমতা রয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং আলাদা আইসিইউ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) আবু হোসেইন মো. মইনুল আহসান বলেন, “দেশের বিভিন্ন এলাকায় হামের সংক্রমণ বাড়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বড় মেডিকেল কলেজগুলোতে আলাদা ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। সব আইসিইউতে এ ধরনের রোগী চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়, তাই সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বিশেষ আইসিইউর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হামের মতো সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকাদান। পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড়।

