শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি
আড়াই হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী করতোয়া নদী—যার তীরে গড়ে উঠেছিল প্রাচীন পুন্ড্র সভ্যতা—আজ দখল ও দূষণের চাপে মৃতপ্রায়। একসময় প্রমত্তা এই নদীতে ঢেউ খেলত, চলত নৌযান; আর এখন তা পরিণত হয়েছে শীর্ণ খালে। পানি নেই, নেই স্রোত—নদীর দুই পাড় দখল করে গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নানা স্থাপনা।
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া করতোয়া ও বাঙালী নদী একসময় উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল। কিন্তু নাব্যতা সংকট, দখল এবং লাগামহীন দূষণে আজ সেই নদীগুলো ধুঁকছে নিঃশব্দে। অনেক স্থানে নদী এতটাই ভরাট ও সংকুচিত হয়েছে যে, শুষ্ক মৌসুমে হেঁটে পার হওয়াও সম্ভব।
উপজেলার কাশিয়াবালা গ্রামের জেলে অমলেশ হাওয়ালদার জানান, ছোটবেলা থেকেই নদীর সঙ্গে তার বেড়ে ওঠা। করতোয়া ও বাঙালী নদীই ছিল তার আয়ের প্রধান উৎস। কিন্তু এখন বছরের বেশিরভাগ সময় নদীতে মাছ পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, “বর্ষায় কিছু মাছ মেলে, কিন্তু বাকি সময় নদী প্রায় মাছশূন্য। জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি।”
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, করতোয়া নদীর উৎপত্তি গাইবান্ধার কাটাখালী নদী থেকে। প্রায় ১২৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এটি শেরপুরের কল্যাণী ঘাট এলাকায় বাঙালী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। অপরদিকে বাঙালী নদী গাইবান্ধার আলাই নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে প্রায় ২১৭ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে ‘ফুলজোর’ নামে পরিচিত হয়ে হুরাসাগরে মিশেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীর বিভিন্ন অংশ দখল করে গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি ও স্থাপনা। পৌরসভার ড্রেনেজ ব্যবস্থা দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ছে। শিল্পকারখানা, রেস্তোরাঁ, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বর্জ্যও মিশছে নদীর পানিতে, যা দিন দিন পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
খানপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আলম প্রামাণিক বলেন, “আগে বড় বড় নৌকা চলত, এখন শুকনো মৌসুমে মানুষ হেঁটে নদী পার হয়।”
উত্তর সাহাপাড়া এলাকার আশুতোষ সরকার জানান, “কারখানার বর্জ্য আর ড্রেনের পানিতে করতোয়ার পানি একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। কিছুদিন আগে নদীতে মাছ ছাড়া হয়েছিল, কিন্তু পরদিনই সব মরে ভেসে ওঠে।
বারদুয়ারী হাট এলাকার আকরাম শেখ বলেন, “এক সময় এই নদী ছিল গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। ধান, গবাদিপশু, মাটির জিনিস—সবই নৌকায় আনা-নেওয়া হতো। এখন নদী ভরাট হয়ে গেছে, নৌকা চলে না।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, শেরপুরের এসআর কেমিক্যাল লিমিটেড ও মজুমদার প্রডাক্টস নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য সরাসরি করতোয়া ও বাঙালী নদীতে ফেলা হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে নিম্নপ্রবাহের ফুলজোর নদীতেও। তবে প্রতিষ্ঠানগুলো অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
মজুমদার প্রডাক্টসের এইচআর অ্যাডমিন রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, “ইটিপিতে পরিশোধনের পরই নদীতে পানি ছাড়া হয়।” এসআর কেমিক্যাল লিমিটেডের কেমিস্ট ফারুখ আকন্দ দাবি করেন, তাদের অধিকাংশ বর্জ্য পুনঃব্যবহার বা বিক্রি করা হয় এবং অবশিষ্ট অংশ ইটিপিতে পরিশোধন করা হয়।
শেরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদুল হাসান বলেন, “নাব্যতা সংকট ও দূষণের কারণে করতোয়া ও বাঙালী নদী এখন প্রায় মৃতপ্রায়। পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন ও পৌরসভাসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে নদীগুলোকে আবারও পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।”
দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ঐতিহ্যবাহী এই নদীগুলো হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.