আজহার আলী, বগুড়া প্রতিনিধি
মানুষের জীবনে চলার পথে আসে কত ঝড়, কত বাধা—তবুও জীবন কি থেমে থাকে? থাকে না। এই সত্যকে নিজের জীবনেই বারবার প্রমাণ করেছেন এক অদম্য নারী। চ্যালেঞ্জকে জয় করে, প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করে, দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে চলা সেই আপসহীন যোদ্ধা মোছা: মেহেরুন নেছা মেরী।
দুঃখ-দুর্দশার ছায়া, সামাজিক বাঁধা-বিপত্তি এবং অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাকে মাথার ওপর রেখেও তিনি এগিয়ে গেছেন নিরন্তর। তাঁর কর্ম ও অধ্যবসায় আজ সমাজে নারীর আত্মপ্রত্যয়, সাহস ও সাফল্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
অভাব-অনটন, সামাজিক সীমাবদ্ধতা এবং পরিবারের দায়-দায়িত্বের মাঝেও ছোটবেলা থেকেই মেরীর মনে জ্বলে ওঠে শিক্ষিত হওয়ার অদম্য স্বপ্ন। তিনি জানতেন, “শিক্ষাই জীবনের সিঁড়ি।” কিন্তু নবম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় চৌদ্দ বছর বয়সে ১৯৯০ সালে তাঁকে বাল্যবিবাহের বন্ধনে আবদ্ধ হতে হয়।
গৃহিণীর ব্যস্ততার মধ্যেও ১৯৯১ সালে এসএসসি এবং ১৯৯৩ সালে এইচএসসি পাস করেন। তারপর শুরু হয় আরও কঠিন অধ্যায়। বৈবাহিক জীবনের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার পথ ধরে এগিয়ে যান।
১৯৯৭ সালে সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে ইসলামী ইতিহাসে অনার্স সম্পন্ন করেন। সেই সময় মাত্র তিন মাস বয়সী অসুস্থ ছেলেকে সামলে পড়াশোনায় অবিচল ছিলেন। ১৯৯৯ সালে ডিগ্রি (পাস কোর্স) এবং ২০০০ সালে দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয়।
২০০৪ সালে দুই সন্তানকে নিয়ে জয়পুরহাটের পাঁচবিবির প্রসেসিং প্রি-ক্যাডেটে শিক্ষকতা শুরু করেন। একই বছরের শেষের দিকে আগইর উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) হিসেবে যোগদান করেন এবং ২০১৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি থেমে থাকেননি। ২০০৫ সালে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের নিবন্ধন লাভের পর মালঞ্চা প্রত্যুপকার নারী উন্নয়ন সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কার্যক্রম শুরু করে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংস্থাটি নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু উন্নয়ন ও সামাজিক কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় পাঁচবিবি এলাকায় ৭ হাজার শিশুকে প্রশিক্ষণ প্রদান, ২০১৮ সালে জয়পুরহাট সদরে ৬৭০ জন ল্যাকটেটিং মাদারকে সহায়তা এবং ২০১৯ সালে আক্কেলপুরে মাতৃত্বকালীন প্রশিক্ষণ প্রদান সংস্থাটির উল্লেখযোগ্য উদ্যোগের মধ্যে অন্যতম।
প্রতিবছর অর্ধ সহস্রাধিক গাছ বিতরণের মাধ্যমে তারা পরিবেশ সুরক্ষায় সচেতনতা সৃষ্টি করে যাচ্ছে। পাশাপাশি ব্লক-বাটিক প্রশিক্ষণ, হাঁস-মুরগি পালনের প্রশিক্ষণ এবং অসহায় মানুষের জন্য নিয়মিত সহায়তা প্রদানের মতো মানবিক কার্যক্রমও সংস্থাটি ধারাবাহিকভাবে পরিচালনা করে আসছে।
২০০৮ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএসএস এবং ২০১২ সালে বিএড সম্পন্ন করেন। ২০১১ সালে লাইট হাউজে চাকরিরত অবস্থায় নিজ উদ্যোগে একটি এনজিওর নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু করেন। মানুষের সেবায় কাজ করার দৃঢ় ইচ্ছাই তাকে এই পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
কিন্তু জীবনের আরেক কঠিন অধ্যায় আসে ২০১২ সালে হঠাৎ ঘটে যায় সংসার বিচ্ছেদ। একজন ডিভোর্সি নারী হিসেবে তাঁকে সমাজের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। তবুও তিনি ভেঙে পড়েননি; বরং প্রতিটি বাধা তাকে আরও দৃঢ় ও সাহসী করেছে।
২০১৩ সালে পৌর উচ্চ বিদ্যালয়ে কম্পিউটার শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তী বছর, ২০১৪ সালে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তরে ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ প্রচেষ্টা ও সংগ্রামের ফসল হিসেবে ২০১৭ সালে তাঁর এনজিও সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন লাভ করে এবং ২০১৯ সালে পায় এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর আনুষ্ঠানিক রেজিস্ট্রেশন। এরপর ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মেরী ফুড অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেড, যার মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি ও নারী-পুরুষের স্বাবলম্বন গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন।
মেরী সমাজ কল্যাণ সংস্থা প্রতিষ্ঠার পর থেকে সমাজের প্রান্তিক ও অসহায় মানুষের কল্যাণে নানা সেবামূলক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। সংস্থাটি নিয়মিতভাবে সেমাই-চিনি বিতরণ, করোনা মহামারির সময় খাদ্য ও মাস্ক বিতরণ এবং জরুরি মানবিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।
আইজিএ প্রকল্পের আওতায় ১,৮০০ জনকে কম্পিউটার ও মোবাইল সার্ভিসিং প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখিয়েছে। ভিজিডি কর্মসূচির মাধ্যমে ২,৫০০ মা ও শিশুকে সহায়তা প্রদান—এসব উদ্যোগ সংস্থার উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে অন্যতম।
এ ছাড়া বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন, পরিবেশ রক্ষায় গাছ বিতরণ, প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসন, নদী রক্ষা আন্দোলন, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানসহ নানা মানবিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। উদ্যোক্তা তৈরিতেও সংস্থাটি কার্যকর ভূমিকা পালন করছে; যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের আইজিএ প্রশিক্ষণের আওতায় আশ্রয়ন প্রকল্পের নারীদের ব্লক-বাটিক ও সেলাই প্রশিক্ষণ প্রদানের মতো উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে।
বর্তমানে বগুড়ায় সংস্থার নিজস্ব ট্রেনিং সেন্টার এবং ডে-কেয়ার সেন্টার কার্যক্রমও চলমান—যা স্থানীয় নারীদের কর্মসংস্থান এবং শিশুর যত্নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
বহু অর্জনের পরও একজন ডিভোর্সি নারী হিসেবে তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছে কঠিন বাস্তবতা। ব্যাংক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঋণ নিতে গিয়ে পড়তে হয়েছে নানা হয়রানিতে। “স্বামী ছাড়া ঋণ দেওয়া যায় না”—এমন মানসিকতার কারণে বহু প্রয়োজনীয় সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন তিনি।
সমাজের রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি এবং একজন নারী হিসেবে বাইরে কাজ করতে গেলে বারবার সহ্য করতে হয়েছে কটূক্তি, হেনস্তা ও মানসিক অবমূল্যায়ন। বিশেষ করে বিভিন্ন দপ্তরে কাজের প্রয়োজনে গেলে অযাচিত মন্তব্য, অবজ্ঞা ও উপেক্ষার আচরণ তাকে আঘাত করেছে গভীরভাবে। তবুও তিনি হার মানেননি; বরং বিশ্বাস করেছেন—বাধা মানুষকে দমায় না, আরও শক্ত করে। সেই বিশ্বাসই তাঁকে পথ চলার শক্তি দিয়েছে।
জীবনের কঠিন চড়াই-উতরাই, তীব্র প্রতিকূলতা ও সামাজিক চাপকে অদম্য সাহস দিয়ে অতিক্রম করে মেহেরুন নেছা মেরী আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন সমাজসেবা, নারী উন্নয়ন ও মানবিক নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল মুখ হিসেবে। তাঁর সংগ্রাম ও সফলতা শুধু ব্যক্তিগত জীবনযুদ্ধের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের অসংখ্য নারীর সম্ভাবনা, আত্মশক্তি ও দৃঢ়তার প্রতীক।
তিনি প্রমাণ করেছেন—নারী যদি নিজের ওপর বিশ্বাস রাখে, তবে বাধা যত কঠিনই হোক না কেন, সামনে এগিয়ে যাওয়া থেমে থাকে না। মেরীর জীবন তাই নতুন প্রজন্মের নারীদের জন্য এক অনুপ্রেরণা, এক আলোকবর্তিকা—যে আলো দেখিয়ে দেয়, সত্যিকারের ইচ্ছাশক্তি থাকলে অসম্ভবও সম্ভব হয়ে ওঠে।

