কবির হোসেন, আলফাডাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি
শীতের সকাল। আকাশের লাজুক পর্দা ভেদ করে কুয়াশার আবছা চাদর সরিয়ে দিচ্ছে শীতের মিষ্টি রোদ। সেই রোদের আলোয় ঝলমল করছে চারপাশ। কলেজের প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখ আটকে যায় এক অপরূপ সৌন্দর্যে। সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাসের ইট-পাথরে গড়া ভবনের সামনে রঙ-বেরঙের ফুলের সমারোহ যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোনো জীবন্ত ক্যানভাস। প্রথম দেখায় যে কারো মনে হতে পারে, এটি কোনো সাজানো উদ্যান কিংবা ব্যক্তিগত কোনো শৌখিন বাগান। কিন্তু মুহূর্তেই বিভ্রম কাটে। কারণ এটি ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা আদর্শ কলেজের ক্যাম্পাস।
ফুলে ফুলে সজ্জিত এই নান্দনিক ক্যাম্পাস যেন কলেজ জীবনে যোগ করেছে এক নতুন মাত্রা। একটু এগিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কলেজের অধ্যক্ষ এম এম মুজিবুর রহমান মুজিবের উদ্যোগ ও সার্বিক তত্ত্বাবধানেই গড়ে উঠেছে এই মন জুড়ানো ফুলের বাগান।
কলেজের শিক্ষকরা জানান, এই ফুলের বাগান শুধু ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, বরং শিক্ষার পরিবেশকে করেছে আরও প্রাণবন্ত, শান্ত ও মনোরম। ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন কলেজের গভর্নিং বডির অভিভাবক সদস্যসহ অন্যান্য সদস্যরাও।
কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী হুমায়রা খন্দকার, একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোসাম্মৎ নিপা ও বৃষ্টি কুন্ডুসহ একাধিক শিক্ষার্থী বলেন,আমাদের কলেজ ক্যাম্পাস এখন ফুলে ফুলে সজ্জিত। ক্যাম্পাসে পা রাখলেই মনটা ভালো হয়ে যায়। ফুলের সৌন্দর্য আর সুবাস ক্লাস ও পরীক্ষার চাপ অনেকটাই ভুলিয়ে দেয়। এমন সুন্দর একটি ক্যাম্পাস উপহার দেওয়ার জন্য আমরা অধ্যক্ষ স্যারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ বহিরাগত শিক্ষার্থীরাও। বোয়ালমারী কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী ঝুমুর বলেন,অন্য কলেজ থেকে এসে এমন সুন্দর ক্যাম্পাস খুব কমই দেখা যায়। ফুলে ঘেরা এই পরিবেশ সত্যিই মন ছুঁয়ে যায়। মনে হয় পড়াশোনার পাশাপাশি প্রকৃতির সান্নিধ্যও এখানে পাওয়া যায়।
ফুলের বাগানে দাঁড়িয়ে কথা হয় কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নীলরতন বিশ্বাসের সঙ্গে। তিনি বলেন,ফুল সবাই ভালোবাসে, কিন্তু ক্যাম্পাসে ফুলের বাগান গড়ে তোলা মোটেও সহজ কাজ নয়। অধ্যক্ষ স্যারের আগ্রহ ও নিরলস পরিশ্রমেই এটি সম্ভব হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সবাই এই বাগান নিয়ে গর্বিত এবং একে রক্ষা করতে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করছে।
বাংলা বিভাগের সহ:অধ্যাপক এ কে এম আরিফুজ্জামান বলেন,এমন নান্দনিক পরিবেশে পড়াশোনা করলে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। ফুলে ঘেরা ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের মননশীলতা ও সৃজনশীলতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সৈয়দ মেহেদী হাসান জানান,এই ফুলের বাগান শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; এটি শিক্ষার্থীদের পরিবেশ সচেতনতা ও সৌন্দর্যবোধ তৈরিতেও বড় ভূমিকা রাখছে।
এ সময় ফুলের বাগানের পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা নাজমুল হোসেন ও রাজু জানান, তারা নিয়মিত বাগানের পরিচর্যা করেন। অধ্যক্ষের পরামর্শ অনুযায়ী ফুল চাষের যাবতীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল বলেই আজ ক্যাম্পাস ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে। বর্তমানে বাগানে গাঁদা, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, কচমচ, গোলাপ, রঙ্গন, হাসনাহেনা, জবা, শিউলি, বেলি, গন্ধরাজসহ নানা জাতের ফুল শোভা পাচ্ছে।
কলেজের গভর্নিং বডির অভিভাবক কামাল হোসেন সদস্য বলেন,আলফাডাঙ্গা আদর্শ কলেজের ক্যাম্পাস এখন শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, বাইরের মানুষের কাছেও একটি আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। অনেকেই এই ফুলের সৌন্দর্য দেখতে এখানে আসেন।
বাগান নিয়ে নিজের অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে অধ্যক্ষ এম এম মুজিবুর রহমান মুজিব বলেন,শৈশব থেকেই বাগান করার প্রতি আমার আলাদা টান ছিল। অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মনে হলো—ক্যাম্পাসটিকে আরও দৃষ্টিনন্দন করা যায়। সেই ভাবনা থেকেই ফুলের বাগান গড়ে তোলা।
কেউ ফুল ছেঁড়ে কি না?এমন প্রশ্নে মৃদু হেসে তিনি বলেন,শুরুতে কিছুটা আশঙ্কা ছিল। ভেবেছিলাম, শত শত শিক্ষার্থীর মধ্যে বাগান টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা আমাকে ভুল প্রমাণ করেছে। তারা একটি ফুলও ছেঁড়ে না; বরং বাগান রক্ষায় সহযোগিতা করছে। এতে আমি সত্যিই গর্বিত।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি জানান, প্রতি মাসেই নতুন নতুন ফুলের গাছ আনা হচ্ছে। দুর্লভ প্রজাতির ফুলের চারা সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে বাগানের পরিসর আরও বাড়ানো হবে।

