ছায়েদ আহামেদ, হাতিয়া(নোয়াখালী) প্রতিনিধি
১৯৬০ সালের ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লে. জেনারেল আযম খানের উদ্যোগে নির্মিত হয় ঐতিহাসিক ‘হাতিয়া রক্ষা বাঁধ’। হাতিয়া দ্বীপের চারদিক ঘিরে নির্মিত এই বেড়িবাঁধের সঙ্গে দ্বীপের মাঝ বরাবর পূর্ব–পশ্চিমে খনন করা হয় সু-পরিকল্পিত সূর্যমুখী খাল। খালটির পূর্বাংশ সূর্যমুখী বাজার হয়ে এবং পশ্চিমাংশ চরচেঙ্গা বাজার হয়ে মেঘনা নদীর সঙ্গে যুক্ত, যা পানি নিষ্কাশন ও সেচ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
কিন্তু নির্মাণের ষাট বছরেরও বেশি সময় পার হলেও এই গুরুত্বপূর্ণ বেড়িবাঁধের পূর্ণাঙ্গ সংস্কার কখনোই হয়নি। ফলে প্রতি বর্ষা ও ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে বাঁধ তীরবর্তী মানুষের দুর্ভোগ যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।
নদীভাঙনের ফলে হাতিয়ার দুটি ইউনিয়ন ইতোমধ্যে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি সৃষ্টি হয়েছে একাধিক চরাঞ্চল।
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার আটটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার চারপাশের বেড়িবাঁধের অধিকাংশ অংশ বর্তমানে খানাখন্দে ভরা, অনেক জায়গায় মাটি সরে গিয়ে জমির সমতলে নেমে এসেছে। বর্ষা মৌসুমে বাঁধের বিভিন্ন ভাঙাচোরা অংশ দিয়ে পানি ঢুকে ফসলি জমি তলিয়ে যায়।
যদিও সূর্যমুখী খালের দক্ষিণাংশ এবং জাহাজমারা এলাকার মুক্তারিয়া অংশে কিছু সংস্কার কাজ হয়েছে, তবে বুড়িরচর রেহানিয়া অংশসহ অধিকাংশ এলাকাই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে সূর্যমুখী খালের উত্তর পাশের প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ নির্মাণের পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো সংস্কারের মুখ দেখেনি।
স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বেড়িবাঁধটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (ওয়াপদা) অধীন থাকলেও নাগরিক চলাচলের প্রয়োজনে কয়েক বছর আগে সূর্যমুখী দক্ষিণ বেড়িবাঁধের কিছু অংশ এলজিইডি ধাপে ধাপে কার্পেটিং করে। কিন্তু উত্তর অংশ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত থাকায় তা এখন চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগী।
গুল্যাখালী গ্রামের মো. ইদ্রিস বলেন, জন্মের পর থেকেই এই বেড়িবাঁধ দিয়ে কষ্ট করে চলাচল করছি। এর বেহাল দশা যেন কারও চোখে পড়ে না।
শুন্যেরচর গ্রামের আব্দুর রহমান বলেন, আমরা আমাদের এলাকার পূর্ব দিকে অন্তত এক কিলোমিটার অংশ পাকাকরণের জন্য তদবির করেছি।
এ বিষয়ে এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. রাহিম জানান, সূর্যমুখী উত্তর বেড়িবাঁধের চৌমুহনী বাজার থেকে পূর্ব দিকে এক কিলোমিটার অংশের এস্টিমেট জমা দেওয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, সপ্তাহখানেকের মধ্যে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় যাওয়ায় যাবে। অবশিষ্ট অংশের জন্য আলাদা প্রকল্পে এস্টিমেট প্রস্তুত করা হচ্ছে।
হাতিয়া উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী এমদাদুল হক বলেন, সূর্যমুখী উত্তর বেড়িবাঁধের পশ্চিমাংশের জন্যও পর্যায়ক্রমে এস্টিমেট তৈরি করে প্রধান প্রকৌশল অধিদপ্তরে জমা দেওয়া হবে।
হাতিয়া রক্ষা বেড়িবাঁধের ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১৯৬০ সালের জলোচ্ছ্বাসের পর গভর্নর জেনারেল আযম খান হেলিকপ্টারে করে হাতিয়া টাউন মডেল হাইস্কুল মাঠে অবতরণ করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল আমিন জানান, সে সময় আযম খান হাতিয়ার মানুষ ও প্রকৃতি দেখে মুগ্ধ হয়ে উপকূলীয় এলাকাগুলোতে বেড়িবাঁধ নির্মাণ, পুষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের জন্য গুঁড়ো দুধ সরবরাহ, চট্টগ্রাম–হাতিয়া নৌ-যোগাযোগ চালু এবং বিদ্যুৎসহ নানা আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেন।
সূর্যমুখী বেড়িবাঁধ- চৌমুহনী এলাকার হাজি হুমায়ুন কবির ও হাজি খবির উদ্দিন জানান, এমনভাবে বেড়িবাঁধটি নির্মাণ করা হয়েছিল- যাতে এর ঢালে মানুষ বসবাস ও গবাদিপশু লালন-পালন করতে পারে। পাশাপাশি সেচ ও পানি নিষ্কাশনের জন্য সুপরিকল্পিত ভাবে সূর্যমুখী খাল খনন করা হয়।
হাজি খবির উদ্দিন ঐতিহাসিক সূত্রের উদ্বৃতি তুলে ধরে বলেন- জেনারেল আযম খান ৬০ এর বন্যা পরবর্তী হাতিয়া হাইস্কুল মাঠে এসে ছাত্রদের উদ্দেশ্য বলেন, “কী কারণে ডাকিলা মোরে? ছাত্ররা উঠিয়া বলে, কতো মানুষ ভাসতেছে জোয়ারের জলে,বেড়ি না হলে বাঁচব না সকলে।
আযম খান উঠিয়া বলে, তুমকো বাঁচাতে হলে হামকো দেশান্তরি( তোমাকে বাঁচাতে হলে আমি হব দেশান্তরি)।
পরে অভুক্ত ও পুষ্টিহীনদের জন্য চট্টগ্রাম থেকে শুকনো খাবার ও গুঁড়ো দুধ নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন তাঁকে বহন করা হেলিকপ্টারে করে। হাইস্কুল মাঠে থাকাবস্থায় এই বলে চট্টগ্রামে হেলিকপ্টারটি পাঠান- ‘হাম এদারমে থায়েঙা,বিমান ওদারমে জায়েঙগা।
হাম বিমানে জায়েঙগা- বিমান ফের এদারমে নেহি আয়েঙগা।’
জানা যায়, এতোসব জনহিতকর কাজে অবদান রাখায় এদেশে তাঁর বেশ সুনাম ও জনপ্রিয়তা তৈরি হয়। ফলে আইয়ুব খান তাঁকে সরিয়ে নিয়ে যান। বাঙালি জনপদ আজও সেই অবাঙালি গভর্নর জেনারেল আযম খান কে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।
বর্তমানে ঐতিহাসিক এই ‘হাতিয়া রক্ষা বাঁধ’ মারাত্মক হুমকির মুখে। স্থানীয়রা জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে নোয়াখালী জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস. এম. রেফাত জামিল বলেন, হাতিয়া একটি দুর্যোগ ও ভাঙনপ্রবণ এলাকা। পুরো বেড়িবাঁধ সংস্কারের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) জমা দেওয়া আছে। তবুও প্রতিবেদকের তথ্য অনুযায়ী জরুরি অংশগুলো খতিয়ে দেখে দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

