শামসুল হক ভূঁইয়া, গাজীপুর
রাজধানীর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের কাজ এক যুগেও শেষ হয়নি। ফলে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এ পথে চলাচলকারী যাত্রীদের। আর ঈদের সময় এ দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা এবং বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা। তাই এবারের ঈদযাত্রাতেও গাজীপুরে বিআরটি প্রকল্প ঘরমুখো মানুষের জন্য ‘গলার কাটা’ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মহাসড়কের মাঝখানে বিআরটি লেনের দুই পাশে বেষ্টনী থাকায় কোনো যানবাহন বিকল হলে বা দুর্ঘটনা ঘটলে সেখানে সহজে উদ্ধারকারী রেকার প্রবেশ করতে পারে না। ফলে দ্রুত যানবাহন সরানো সম্ভব হয় না এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ পরিস্থিতিতে এবারের ঈদযাত্রাতেও গাজীপুর অংশে বড় ধরনের যানজট দেখা দিতে পারে।
রাজধানীর প্রবেশমুখ গাজীপুর দিয়ে দেশের উত্তরাঞ্চলসহ প্রায় ৩২টি জেলার মানুষ যাতায়াত করে। প্রতি বছর ঈদের ছুটিতে নানা ভোগান্তি নিয়ে এসব মানুষকে গন্তব্যে যেতে হয়। এবছরও নির্মাণাধীন সড়ক, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, যত্রতত্র পার্কিং এবং যাত্রী ওঠানামার কারণে ভোগান্তির আশঙ্কা করছেন যাত্রীরা। তবে ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন নানা উদ্যোগ নিয়েছে।
পুলিশ ও প্রশাসনের সূত্রে জানা গেছে, ঈদ উপলক্ষে ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন, সড়ক-মহাসড়ক সংস্কার, মহাসড়কের পাশে অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ, অবৈধ পার্কিং বন্ধ এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি পরিবহনগুলোকে ট্রাফিক আইন মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হবে।
গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত নির্দিষ্ট লেনে দ্রুত, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন চালুর লক্ষ্যে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে বিআরটি প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। প্রায় ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার সড়কে প্রকল্পটির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল চার বছর এক মাস। তবে নানা জটিলতায় প্রকল্পটির মেয়াদ পাঁচ দফা বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনও তা সম্পন্ন হয়নি।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (ট্রাফিক) অমৃত সূত্রধর জানান, মহানগরের চান্দনা চৌরাস্তা মোড়ের পশ্চিমে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কয়েকটি স্থানে বড় ধরনের খানা-খন্দক রয়েছে। ঈদের আগে সেগুলো মেরামত না করা হলে যানবাহনের গতি কমে যাবে এবং যানজটের সৃষ্টি হতে পারে। বিষয়টি সড়ক ও জনপথ বিভাগকে জানানো হলেও তারা বাজেটের সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছে।
এদিকে ঈদের সময় গাজীপুরে পর্যাপ্ত পরিবহন না থাকায় অনেক চালক মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন নিয়ে সড়কে নামেন। এসব যানবাহন মাঝপথে বিকল হয়ে বা দুর্ঘটনায় পড়ে মহাসড়কে যানজটের সৃষ্টি করে।
বাসচালক কালাম মিয়া বলেন, গাজীপুরের বাঘের বাজার, নয়নপুর বাজার, জৈনাবাজার ও এমসি বাজার এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বড় অংশই কাঁচাবাজার ও হকারদের দখলে থাকে। এছাড়া সড়কের পাশে দোকানপাট ও অটোরিকশা দাঁড়িয়ে থাকায় যানবাহন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে না। ঈদের আগে কেনাকাটার ভিড়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়। তখন ৪০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগে।
যাত্রী ও চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী স্টেশন রোড, কলেজ গেট, বোর্ড বাজার, চান্দনা চৌরাস্তা, ভবানীপুর, বাঘের বাজার, শ্রীপুর উপজেলার গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি, মাওনা চৌরাস্তা, এমসি বাজার, নয়নপুর ও জৈনাবাজার এলাকায় যানজটের আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া চান্দনা চৌরাস্তার ফ্লাইওভার পুরোপুরি চালু না হওয়ায় সেখানেও ভোগান্তি বাড়তে পারে।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ট্রাফিক) এস এম আশরাফুল আলম বলেন, ঈদের আগে পোশাক কারখানা ছুটি হলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক একযোগে বাড়ি ফেরার জন্য সড়কে নামেন। তখন মানুষের তুলনায় পরিবহন কম থাকায় যানজট সৃষ্টি হয়। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, চান্দনা-চৌরাস্তা এলাকায় ময়মনসিংহ থেকে ঢাকাগামী ফ্লাইওভারের একটি অংশ চালু করা হয়েছে, ফলে যানবাহন চলাচলে কিছুটা স্বস্তি মিলবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
যানজট নিরসনে পরিবহন মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। ঈদে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ এবং সড়কে যত্রতত্র গাড়ি থামানো বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঈদ উপলক্ষে সড়কে পোশাকধারী ও সাদা পোশাকে অতিরিক্ত পুলিশ, র্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। এছাড়া যানবাহনের চাপ কমাতে পোশাক কারখানাগুলোতে ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক হয়ে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬টি জেলার যানবাহন চলাচল করে। প্রতি বছর ঈদযাত্রায় এ মহাসড়কে যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা ত্রিমোড়ে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) শফিউদ্দিন বলেন, “ঈদযাত্রায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মৌচাক থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত যানজটের আশঙ্কা থাকে। আগের অভিজ্ঞতার আলোকে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আশা করছি, এবারের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন হবে।”
তিনি আরও জানান, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক সভায় ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে এবং যানজট নিরসনে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনারও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সভায় গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম মঞ্জুরুল করিম রনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা সময়মতো পরিশোধ এবং ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়ার জন্য মালিকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

