রেজোয়ান চৌধুরী,গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি
গোপালগঞ্জে একদল শিক্ষার্থীর উদ্যোগে ছিন্নমূল, দরিদ্র ও নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষের জন্য মাসব্যাপী ইফতার আয়োজন করা হচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রজ্বলিত গোপালগঞ্জ–এর উদ্যোগে রমজান মাসজুড়ে এই মানবিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
জানা গেছে, ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটি প্রতিবছরের মতো এবারও রমজানের প্রথম দিন থেকেই গোপালগঞ্জ পৌর পার্কের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে পথচারী রোজাদারদের জন্য ইফতার বিতরণ করছে। প্রতিদিন বিকেলের পর থেকে এখানে জড়ো হন রিকশা ও ভ্যানচালকসহ বিভিন্ন পেশার খেটে খাওয়া মানুষ, পথচারী এবং নিম্নআয়ের শ্রমজীবীরা। তাদের অনেকেই কর্মব্যস্ততার কারণে সময়মতো বাড়িতে গিয়ে ইফতার করতে পারেন না কিংবা সামর্থ্যের অভাবে ভালো খাবার খেতে পারেন না।
সংগঠনের সদস্যরা জানান, বাবা-মায়ের দেওয়া পকেট খরচ বা টিফিনের টাকা সঞ্চয় করে, পাশাপাশি সদস্যদের চাঁদা, পরিবার ও শুভানুধ্যায়ী মানুষের সহযোগিতায় এই ইফতার আয়োজন পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিদিন সকালে বাজার করা থেকে শুরু করে রান্নাবান্না এবং ইফতার পরিবেশন পর্যন্ত সব কাজই সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা নিজের হাতে সম্পন্ন করেন।
ইফতার করতে আসা এক রিকশাচালক বলেন, “প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় করি। এর মধ্যে গ্যারেজে রিকশার ভাড়া দিতে হয় আড়াইশ টাকা। বাকি টাকা দিয়ে ইফতার কিনে খেলে সংসারের বাজার করা কঠিন হয়ে যায়। তাই এখানে এসে ইফতার করতে পারি।”
আরেক রিকশাচালক বলেন, “রিকশা চালাতে চালাতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। বাড়ি যাওয়ার সময় থাকে না। তাই প্রতিদিন পৌর পার্কে এসে প্রজ্বলিত গোপালগঞ্জের দেওয়া ইফতার খেয়ে রোজা ভাঙি। এতে খুব ভালো লাগে।”
সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক রেজোয়ান আহমাদ চৌধুরী বলেন, “আমরা প্রতিদিন সকালে বাজার করি এবং দুপুর থেকে রান্নাবান্না শুরু করি। নিজেদের হাতে তৈরি খাবার খেটে খাওয়া ও পথচারী মানুষের মাঝে ইফতার হিসেবে তুলে দিতে পারলে আমরা মানসিক শান্তি পাই। প্রতিদিন সাধারণত ১৫০ থেকে ২০০ মানুষের জন্য ইফতারের আয়োজন করা হয়, তবে কোনো কোনো দিন এই সংখ্যা পাঁচ শতাধিক ছাড়িয়ে যায়।”
সংগঠনের টিম লিডার জোবায়ের খান রাব্বি জানান, কোনো দিন ছোলা-মুড়ি, পেঁয়াজু, আলুর চপ, বেগুনি, খেজুর ও শরবত দেওয়া হয়। আবার কোনো দিন চিড়া-দই, কলা ও ফল পরিবেশন করা হয়। অর্থের পরিমাণ বেশি হলে ডিম খিচুড়ি বা বিরিয়ানির আয়োজনও করা হয়।
সংগঠনের সহকারী পরিচালক সাগর আহমেদ বলেন, “আমাদের সংগঠনের প্রায় ৩০০–এর বেশি সদস্য রয়েছে, যাদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী। সদস্যদের চাঁদা ও নিজেদের পকেট মানির টাকা বাঁচিয়ে এই আয়োজন করা হয়। অনেক সময় শুভানুধ্যায়ী ও বিত্তবানরাও সহযোগিতা করেন।”
সংগঠনের পরিচালক শফিকুল ইসলাম রানা বলেন, “সমাজে অনেক মানুষ আছেন, যাদের ইফতারের একমাত্র আইটেম শুধু পানি। আমরা চাই কেউ যেন শুধু পানি দিয়ে ইফতার না করে। সেই লক্ষ্যেই আমাদের এই আয়োজন। সকলের সহযোগিতা পেলে ইনশাআল্লাহ পুরো রমজান মাসজুড়ে এই কার্যক্রম চালিয়ে যাব।”
প্রতিদিন বিনামূল্যে ইফতার পেয়ে ছিন্নমূল, হতদরিদ্র ও নিম্নআয়ের বহু মানুষ আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন এবং তাদের জন্য দোয়া করছেন।

