জাবিপ্রবি প্রতিনিধি
জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবিপ্রবি) ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উদ্যাপনের অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলন বিরোধী ও আওয়ামীপন্থী বিতর্কিত শিক্ষকদের চরম তোপের মুখে পড়তে হয়েছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে নিয়ে চরম কটূক্তিকারী এক শিক্ষককে প্রথম সারি থেকে উঠিয়ে বের করে দিয়েছেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ও সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল। একই অনুষ্ঠানে খোলস পাল্টে নিজেকে ‘বিএনপি’ দাবি করে বক্তব্য দিতে যাওয়া সাময়িক বরখাস্তকৃত আরেক আওয়ামীপন্থী শিক্ষককেও জনসম্মুখে অপমান করে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দিয়েছেন তিনি।
বুধবার (৫ আগস্ট) ক্যাম্পাসে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ফ্যাসিবাদের দোসরদের এমন উপস্থিতিতে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামালপুর-৩ (মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল।
প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রথম সারিতে আসন গ্রহণ করেন বিগত সরকারের সুবিধাভোগী সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি এবং সমাজকর্ম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. এ. এইচ. এম মাহবুবুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন আওয়ামীপন্থী শিক্ষক।
জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে আয়োজিত এই মঞ্চের সামনে বসে থাকা ড. মাহবুবুরকে দেখে উপস্থিত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ২০২৪ এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আন্দোলনের সময় আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে দমন-পীড়নের পক্ষে বৈধতা উৎপাদন করতে ৩০ জুলাই “দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ” পত্রিকায় “ধ্বংসযজ্ঞ দেখে কাঁদলেন প্রধানমন্ত্রী পাশে দাঁড়ালেন নিহত ছাত্রদের” শিরোনামে তিনি ‘জিয়াউর রহমান মুক্তিযোদ্ধাদের ফাঁসি দিয়ে হত্যা করেছেন’ এবং ‘খালেদা জিয়া ১৭ জন কৃষককে সার চাওয়ার অপরাধে গুলি করে হত্যা করেছে’ বলে সম্পাদকীয়তে সম্পাদকীয় লিখেছিলেন। এছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি সংবাদপত্রে প্রবন্ধ লিখে ছাত্র আন্দোলনের কড়া সমালোচনা করেন এবং সরকারের হত্যাযজ্ঞের পক্ষে ‘বৈধতা’ উৎপাদনের চেষ্টা চালান।
ফ্যাসিবাদের এই কট্টর সমর্থককে প্রথম সারিতে বসে থাকতে দেখে একপর্যায়ে মেজাজ হারিয়ে ফেলেন প্রধান অতিথি সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল। তিনি তাৎক্ষণিক ড. মাহবুবুরসহ সেখানে উপস্থিত ফ্যাসিবাদের দোসর শিক্ষকদের অনুষ্ঠান থেকে অবিলম্বে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। প্রকাশ্য এই তোপের মুখে সবার সামনে চরম অপমান ও অপদস্ত হয়ে তারা দ্রুত অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
অনুষ্ঠানে সবচেয়ে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় সাময়িক বরখাস্তকৃত সহকারী অধ্যাপক (সমাজকর্ম বিভাগ) ড. মো. আল মামুন সরকারের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। বিগত সরকারের আমলে ‘উন্নয়নের রোল মডেল শেখ হাসিনা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপনকারী এবং টকশোতে শেখ ফজিলাতুন্নেছার বন্দনা করা এই শিক্ষক মঞ্চে উঠে হঠাৎ খোলস পাল্টানোর চেষ্টা করেন।
বক্তব্যে তিনি নিজেকে বিগত সরকারের ‘কট্টর সমালোচক’ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করে বলেন, "বাংলাদেশের যে চারজন শিক্ষক এই ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরোধিতা করতে সাহস করেছিল, তার মধ্যে ড. আসিফ নজরুল ও আমি একজন।" তিনি দাবি করেন, বিগত সরকারের আমলে তিনি চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের রাজনীতির পথ সুগম করেছেন। একপর্যায়ে তিনি নিজেকে ‘বিএনপি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে বলেন, "আমি ছাত্রদলের আদর্শের একজন সৈনিক হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করব।"
এই শিক্ষকের মুখে হঠাৎ এমন ‘বিএনপি-প্রীতি’ ও নিজেকে ড. আসিফ নজরুলের সমকক্ষ দাবি করতে শুনে উপস্থিত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে প্রধান অতিথি সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দেন। সবার উপস্থিতিতে তাকে বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেন এবং দ্রুত বক্তব্য শেষ করে মঞ্চ থেকে নেমে যেতে নির্দেশ দেন। জনসম্মুখে চরম অপমানিত হয়ে তিনি দ্রুত মঞ্চ ছাড়তে বাধ্য হন।
এর আগে আওয়ামী লীগের কমিটিতে নাম থাকা এক কর্মচারী বক্তব্য দিতে উঠলেও একই রকম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
পরপর ঘটা এই দুই ঘটনার পর প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, ‘এই মঞ্চটা বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, এটি জুলাই অভ্যুত্থানের সাথে যুক্ত ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির মঞ্চ। কিন্তু বটম লাইন হচ্ছে—ফ্যাসিবাদ। ওই ফ্যাসিবাদের দোসরদের সাথে একই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা আমাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।’
ক্যাম্পাসে ফ্যাসিবাদের চর্চা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘দয়া করে এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরে কেউ নোংরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করার চেষ্টা করবেন না। এটি মেলান্দহ বাজার না, এটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। এখানে দাঁড়িয়ে কার বক্তব্যের ধরন কী হবে, তা সবার বিবেচনায় থাকা উচিত। আচার-আচরণে ফ্যাসিবাদের বহিঃপ্রকাশ ঘটাবেন না। ফ্যাসিবাদ বাংলাদেশের মানুষ, ক্যাম্পাস বা ছাত্রসমাজ কেউ সহ্য করে না।’
জাবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আমির হোসেনের সভাপতিত্বে এই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. জি এম মুজিবুর রহমান।
এর আগে সকালে বৈরী আবহাওয়ার কারণে দেরিতে শুরু হওয়া কর্মসূচিতে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। পরে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ চারজনের পরিবারের সদস্যদের হাতে সম্মাননা স্মারক, ক্রেস্ট ও আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.