স্টাফ রিপোর্টার, নড়াইল
বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী আজ সোমবার (১০ আগস্ট)। বরেণ্য এই শিল্পীর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে নড়াইলে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা, জেলা প্রশাসন, জেলা শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এসব কর্মসূচির আয়োজন করেছে।
শিল্পী এস এম সুলতান, যিনি ‘লাল মিয়া’ নামে পরিচিত ছিলেন, ১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মেছের আলী ছিলেন পেশায় রাজমিস্ত্রি। শৈশব থেকেই সুলতানের মধ্যে চিত্রাঙ্কনের প্রতিভা দেখা যায়।
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় নড়াইলের তৎকালীন জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায়ের নজরে পড়েন সুলতান। তাঁর সহযোগিতায় তিনি কলকাতার খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ, শিল্প-সমালোচক ও কলকাতা আর্ট স্কুলের গভর্নিং বডির সদস্য অধ্যাপক সয়দ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে পরিচিত হন। পরে একাডেমিক যোগ্যতা বিবেচনায় বিশেষ ব্যবস্থায় ১৯৪১ সালে অষ্টম শ্রেণি পাস সুলতান কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান।
১৯৪৪ সালে কলেজের তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে চতুর্থ বর্ষে উত্তীর্ণ হন তিনি। তবে পরবর্তীতে প্রথাগত শিক্ষার গণ্ডি ছেড়ে কাশ্মীরের পাহাড়ি অঞ্চলে গিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা নিয়ে ছবি আঁকতে শুরু করেন। এরপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন এই শিল্পী।
এস এম সুলতান যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ সফর করেন। এসব দেশে খ্যাতিমান শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়। ১৯৫৫-৫৬ সালের দিকে জন্মভূমির টানে নড়াইলে ফিরে আসেন তিনি। নিজ উদ্যোগে মাছিমদিয়ার বাড়িতে গড়ে তোলেন ফাইন আর্ট স্কুল ও ‘শিশুস্বর্গ’।
শিশু-কিশোরদের প্রতি বিশেষ অনুরাগী সুলতান ১৯৮০ সালে নিজ বাড়িতে ‘শিশুস্বর্গ’-এর অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করেন। পরে ১৯৯২ সালে ৬০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৫ ফুট প্রস্থের ‘ভ্রাম্যমাণ শিশুস্বর্গ’ নামে একটি দ্বিতল নৌকা নির্মাণ করেন। ওই নৌকায় শিশুদের নিয়ে চিত্রা নদীতে ভ্রমণ করতেন এবং তাদের চিত্রাঙ্কন শেখাতেন।
সুলতানের চিত্রকর্মে ফুটে উঠেছে বাংলার কৃষক, জেলে, তাঁতি, কামার, কুমারসহ গ্রামীণ জনজীবনের নানা অনুষঙ্গ। তাঁর ছবিতে মাঠ, নদী, হাওর, বাঁওড়, পালতোলা নৌকা, জঙ্গল ও সবুজ প্রান্তরের পাশাপাশি বাংলার শ্রমজীবী মানুষের জীবন-সংগ্রাম বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে।
তাঁর চিত্রকর্ম ভারতের সিমলা, পাকিস্তানের লাহোর ও করাচি, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও বোস্টন, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডনসহ বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শিত হয়েছে। বাংলাদেশেও শিল্পকলা একাডেমি ও জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাঁর চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়।
চিত্রাঙ্কনের পাশাপাশি এস এম সুলতান বাঁশি বাজাতেন এবং পশু-পাখির প্রতিও তাঁর বিশেষ ভালোবাসা ছিল। তাঁর বাড়িতে সাপ, বেজি, ভল্লুক, বানর, খরগোশ, মদনটাক, ময়না, গিনিপিগ, মুনিয়াসহ বিভিন্ন প্রাণী নিয়ে একটি মিনি চিড়িয়াখানাও গড়ে তুলেছিলেন তিনি।
শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এস এম সুলতান ১৯৮২ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদক লাভ করেন। এছাড়া ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্ট আর্টিস্ট এবং ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সম্মাননা পদক পান।
১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর দীর্ঘদিন শ্বাসকষ্টে ভোগার পর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই চিরকুমার শিল্পী। পরে নড়াইলে তাঁর নিজ বাড়ির আঙিনায় তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে নিজ বাড়িতে নির্মাণ করা হয়েছে ‘এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা’।
জন্মবার্ষিকীর কর্মসূচি
এস এম সুলতানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সোমবার সকাল ৬টায় কোরআন খতম, সকাল ৯টায় শিল্পীর কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং সকাল সাড়ে ১০টায় আলোচনা সভা ও সম্মাননা পদক প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এমপির। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা, নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম এবং নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চু।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির সভাপতি এবং নড়াইলের জেলা প্রশাসক।
বরেণ্য এই শিল্পীর জন্মবার্ষিকী ঘিরে নড়াইলে ইতোমধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। শিল্পী সুলতানের শিল্পকর্ম ও জীবনাদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এবারের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.