জয়পুরহাট প্রতিনিধি
কিডনির হাট নামে পরিচিত জয়পুরহাটের কালাইয়ে কিডনি কেনাবেচা চক্রের মূলহোতা হিসেবে পরিচিত আব্দুস সাত্তার (৫৪)কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বুধবার (১২ আগস্ট) দিবাগত রাতে বগুড়া সদরের পৌরপার্ক এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার আব্দুস সাত্তার কালাই উপজেলার বহুতি গ্রামের মৃত আব্দুল জব্বার খলিফার ছেলে। তার বিরুদ্ধে কিডনি কেনাবেচার অভিযোগে কালাই থানায় পাঁচটি মামলা রয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কালাই থানার তদন্ত কর্মকর্তা দীপেন্দ্র নাথ সিংহ।
সর্বশেষ যে মামলায় আব্দুস সাত্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেই মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, আর্থিক সংকটে থাকা গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ এলাকার মন্টু মিয়াকে কিডনি বিক্রির জন্য ১০ লাখ টাকার প্রলোভন দেখানো হয়। পরে তাকে ঢাকায় নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয়। কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য নেপাল যাওয়ার উদ্দেশ্যে তার পাসপোর্টও তৈরি করা হয়।
চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে মন্টু মিয়াকে অগ্রিম ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। পরে তাকে নেপালের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার একটি কিডনি অপসারণের কয়েক দিন পর তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
দেশে ফেরার পর চুক্তি অনুযায়ী বাকি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন মন্টু মিয়া। তবে আব্দুস সাত্তারসহ অন্য দালালরা তাকে টাকা না দিয়ে বিভিন্নভাবে টালবাহানা করতে থাকেন বলে মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
কিডনি বিক্রির টাকা না পেয়ে মন্টু মিয়া গত ১৩ জুন জয়পুরহাট আমলি আদালতে বগুড়া সদর উপজেলার নিশিন্দারা গ্রামের সাব্বির আহমেদ, শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক মল্লিকপাড়া গ্রামের সুমন আলী, কালাই উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের আব্দুল মান্নান ও সাইদুর রহমান, লওনা গ্রামের আব্দুস সাত্তার এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ছোট হোসেনপুর রাজাগঞ্জ এলাকার তারেক আজম ওরফে বাবলু চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা করেন। আদালতের নির্দেশে একই দিন মামলাটি কালাই থানায় রেকর্ড করা হয়।
মামলার এজাহারে থাকা তারেক আজম ওরফে বাবলু চৌধুরীকে কিডনি কেনাবেচা চক্রের ‘মহাজন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ঢাকার রায়েরবাগ এলাকায় থেকে জয়পুরহাটে দালাল নিয়োগ করে দরিদ্র মানুষকে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে দেশে-বিদেশে কিডনি কেনাবেচা করে আসছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কালাইয়ে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় কিডনি কেনাবেচা চক্রটি দরিদ্র, ঋণগ্রস্ত ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষকে টার্গেট করে কিডনি বিক্রিতে প্রলুব্ধ করে আসছে। প্রশাসনের নজরদারির কারণে একসময় এ কার্যক্রম কিছুটা কমলেও গত এক বছরে চক্রটি আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়ভাবে কিডনির হাট হিসেবে পরিচিত এলাকার মধ্যে রয়েছে মাত্রাই ইউনিয়নের ভেরেন্ডি, উলিপুর, সাতার, কুসুমসাড়া, অনিহার, ভাউজাপাতার, শিবসমুদ্র, পাইকশ্বর ও ইন্দাহার; উদয়পুর ইউনিয়নের তালোড়া-বাইগুনি, বহুতি, মোহাইল, থল, বাগইল, মাস্তর, জয়পুর বহুতি, নওয়ানা বহুতি, দুর্গাপুর, উত্তর তেলিহার, ভুষা, কাশিপুর, বিনইল ও পূর্বকৃষ্টপুর; এবং আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের রাঘবপুর, বোড়াই, হারুঞ্জা, নওপাড়া ও বালাইট গ্রাম। এছাড়া কালাই পৌরসভার আঁওড়া, থুপসারা, সিতাহার ও দুরুঞ্জ-নয়াপাড়া এবং জিন্দারপুর ইউনিয়নের এলতা, ইমামপুর, বেগুনগ্রাম, করিমপুর ও হাজিপুর-ঘাটুরিয়া এবং পুনট ইউনিয়নের জালাইগাড়ী, পাঁচগ্রাম, জগডুম্বর ও শান্তিনগর এলাকাতেও এ ধরনের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।
মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, ১৯৯৯-এর ৯ ধারায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কেনাবেচা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই আইনের ১০(১) ধারায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেনাবেচা কিংবা এ কাজে সহায়তার জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
কালাই থানার তদন্ত কর্মকর্তা দীপেন্দ্র নাথ সিংহ বলেন, কিডনি-সংক্রান্ত প্রতারণার মামলাটি থানায় গ্রহণের পর এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করা হয়। প্রযুক্তির সহায়তায় বুধবার রাতে বগুড়া সদরের পৌরপার্ক এলাকায় অভিযান চালিয়ে এজাহারভুক্ত আসামি আব্দুস সাত্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে বৃহস্পতিবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.