যশোর প্রতিনিধি
পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে যশোর পৌরসভা। রয়েছে শত শত পরিচ্ছন্নতাকর্মী, বর্জ্যবাহী ট্রাক, কন্টেইনার ও আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার। কিন্তু এত আয়োজন ও ব্যয়ের পরও যশোর শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, আবাসিক এলাকা ও বাজারে পড়ে থাকছে ময়লার স্তূপ। ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ, বাড়ছে জনদুর্ভোগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল পেরিয়ে দুপুর হলেও শহরের বিভিন্ন এলাকায় ডাস্টবিনের বাইরে গৃহস্থালি বর্জ্য পড়ে আছে। কোথাও ড্রেনের ওপর জমে রয়েছে পচা ময়লা, আবার কোথাও রাস্তার পাশে তৈরি হয়েছে অনানুষ্ঠানিক ডাম্পিং স্পট। এসব ময়লার স্তূপে গরু, ছাগল, কুকুর ও কাক বিচরণ করে বর্জ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে বাতাসে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ।
পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, যশোর শহরে প্রতিদিন প্রায় ৮০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। বছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৯ হাজার ২০০ টন। এসব বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণে ৬০৩ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োজিত রয়েছেন।
শুধু ৬০৩ পরিচ্ছন্নতাকর্মীর দৈনিক মজুরি বাবদ পৌরসভার ব্যয় প্রায় ৩ লাখ ১ হাজার ৫০০ টাকা। মাসে এ ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৯০ লাখ ৪৫ হাজার টাকা এবং বছরে প্রায় ১১ কোটি ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এর সঙ্গে বর্জ্যবাহী ট্রাকের জ্বালানি, চালক ও সহকারীদের বেতন, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ, ডাম্পিংসহ অন্যান্য ব্যয় যোগ হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় মোট খরচ আরও বাড়ে।
অর্থাৎ, প্রতিদিনের ৮০ টন বর্জ্যের বিপরীতে শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মজুরি বাবদ প্রতি টনে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার ৭৬৯ টাকা।
বর্জ্য পরিবহনে রয়েছে ১০টি ছোট ও দুটি বড়সহ মোট ১২টি ট্রাক। পৌর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি ট্রাক প্রতিদিন তিনবার করে বর্জ্য নিয়ে ডাম্পিংয়ের উদ্দেশ্যে যাতায়াত করে। প্রতিবার একটি ট্রাকের যাতায়াত ১০ কিলোমিটার ধরে প্রতিটি ট্রাক দৈনিক প্রায় ৩০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। ১২টি ট্রাক মিলিয়ে দৈনিক চলাচলের দূরত্ব দাঁড়ায় প্রায় ৩৬০ কিলোমিটার।
ট্রাকগুলো প্রতি লিটার ডিজেলে ২০ কিলোমিটার চললে প্রতিদিন প্রায় ১৮ লিটার জ্বালানি প্রয়োজন হয়। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০৫ টাকা ধরে দৈনিক জ্বালানি ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৮৯০ টাকা। মাসে এ ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৫৬ হাজার ৭০০ টাকা। এর বাইরে রয়েছে চালক ও সহকারীদের বেতন, গাড়ি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ, টায়ার, ব্যাটারি, ডাম্পিং, শোধনাগার পরিচালনা, কন্টেইনার, ডাস্টবিন নির্মাণ ও প্রশাসনিক ব্যয়।
তারপরও দুপুর পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন স্থানে ময়লা পড়ে থাকছে।
যশোর পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা জায়েদ হোসেন বলেন, ‘সর্বশেষ মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে সকাল ৯টার মধ্যে শহরের ময়লা অপসারণের কাজ শেষ করার। কিন্তু মণিহারসহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যানজট থাকায় বর্জ্যবাহী গাড়িগুলো নির্ধারিত সময়ে ফিরে আসতে পারে না। ফিরে আসতে সময় লাগায় বর্জ্য অপসারণের কাজও পিছিয়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি ওয়ার্ডের জন্য একটি করে গাড়ি রয়েছে। কোনো ওয়ার্ডের গাড়ি বিকল হলে পাশের ওয়ার্ডের গাড়ি দিয়ে সেখানে সাময়িকভাবে বর্জ্য অপসারণ করা হয়। ওই গাড়িকে আগে নিজের ওয়ার্ডের কাজ শেষ করে অন্য ওয়ার্ডে যেতে হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বর্জ্য অপসারণে সময় বেড়ে যায়।’
শহরের ডোমার হোটেলের পাশে শামছুর রহমানের বাড়ির সামনে দীর্ঘদিন ধরে ময়লার স্তূপ পড়ে থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা শামছুর রহমান বলেন, ‘পৌরসভার লোকজন ময়লা নিতে আসে। কিন্তু অনেক সময় পুরো ময়লার স্তূপ না তুলে কয়েক ঝুড়ি ময়লা গাড়িতে নিয়ে চলে যায়। বাকি ময়লা পড়ে থাকে। পরে পচা ময়লার দুর্গন্ধে আশপাশের বাসিন্দাদের দুর্ভোগ হয়। কুকুর ও গরু ময়লা ছড়িয়ে রাস্তায় নিয়ে আসে।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘোপ সেন্ট্রাল রোড, বেজপাড়া পিয়ারী মোহন রোড, পালবাড়ির হর্টিকালচারের সামনে, রেলগেট, কাজীপাড়া, মণিহার, আরবপুর, ঢাকা রোড, পুরাতন কসবাসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র দেখা যায়।
জেল রোডে আশিক সিমেন্টের কর্মচারী আসিফ হোসেন বলেন, ‘ডাস্টবিনের পাশে ময়লার স্তূপ জমে থাকে। কয়েক দিন ময়লা পরিষ্কার না হওয়ায় দুর্গন্ধে দোকানে বসে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।’
চা দোকানি আব্দুল মজিদও একই ধরনের অভিযোগ করেন।
বেজপাড়া পিয়ারী মোহন রোডের বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘বিভিন্ন ওয়ার্ড ও বাজার থেকে রিকশা, ভ্যান ও মোটরসাইকেলে করে গৃহস্থালি বর্জ্য, মাছ ও মুরগির নাড়িভুঁড়ি, গোবর, পশুর বর্জ্য ও মৃত প্রাণী ফেলা হয়। দুর্গন্ধের কারণে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে হয়।’
সরেজমিনে চৌরাস্তা পুরাতন কোতোয়ালি মডেল থানার সামনে, চিত্রা মোড়ের গোহাটা রোড, বেজপাড়া পিয়ারী মোহন রোড, ঘোপ সেন্ট্রাল রোড, ফাতেমা হাসপাতালের সামনে, রেলগেট ডোমার হোটেলের পাশে, রেলগেট জামে মসজিদের সামনে, জিলা স্কুলের সামনে, ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি ও কালেক্টরেট স্কুলের পাশে, লোহাপট্টি রোড, যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের কাঁঠালতলা, রয়েল মোড়, পালবাড়ির হর্টিকালচারের সামনে, ঘোপ ধানপট্টি, কাজীপাড়া, মণিহার, আরবপুর, ঢাকা রোড ও পুরাতন কসবা এলাকায় বিভিন্ন স্থানে ময়লার স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
কন্টেইনার সরানো হলেও বিকল্প ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
পৌরসভার নথি অনুযায়ী, শহরে ৪০টি বড় ও ৫০০টি মাঝারি আকারের কন্টেইনার থাকার কথা। অর্থাৎ মোট ৫৪০টি কন্টেইনার থাকার কথা থাকলেও শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান থেকে একের পর এক কন্টেইনার সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
সেন্ট্রাল রোডে দুটি স্থায়ী ডাস্টবিন নির্মাণ করা হয়েছে। বিএড কলেজের সামনেও স্থায়ী ডাস্টবিন নির্মাণ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে নয়টি ওয়ার্ডে স্থায়ী ডাস্টবিন গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বিকল্প অবকাঠামো পুরোপুরি প্রস্তুত করার আগেই কন্টেইনার সরিয়ে নেওয়ায় অনেক এলাকায় বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট স্থান সংকুচিত হয়েছে।
পৌরসভার নথি আরও বলছে, শহরে প্রায় এক লাখ পরিবার রয়েছে। অথচ গৃহস্থালি বর্জ্য ফেলার জন্য আধুনিক পাত্র বা ডাস্টবিন সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ১০ হাজার পরিবারকে। ফলে প্রায় ৯০ হাজার পরিবার আধুনিক বর্জ্য সংগ্রহ কাঠামোর বাইরে রয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন এনজিও বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মাসে প্রায় ১৫০ টাকা করে দিতে হয়। ১০ হাজার পরিবার মাসে ১৫০ টাকা দিলে মাসে ১৫ লাখ এবং বছরে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা হয়। তবে বাস্তবে কত পরিবার এ ফি দেয়, মোট কত টাকা আদায় হয় এবং সংগৃহীত অর্থের কত অংশ বর্জ্য সংগ্রহে ব্যয় হয়—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা হয়নি।
৪০ টন সক্ষমতার শোধনাগারে প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে মাত্র ১০ টন
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আরেকটি বড় দুর্বলতা ঝুমঝুমপুরের বর্জ্য শোধনাগার। ২০১৯ সালে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করা শোধনাগারটির দৈনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা ৪০ টন। কিন্তু বর্তমানে সেখানে মাত্র ১০ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে। অর্থাৎ সক্ষমতার মাত্র ২৫ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে। প্রতিদিন ৩০ টন সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকছে।
প্রতিদিন ৮০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হলে বছরে প্রায় ২৯ হাজার ২০০ টন বর্জ্য তৈরি হয়। এর বিপরীতে শোধনাগারে বছরে প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার ৬৫০ টন। অর্থাৎ মোট উৎপাদিত বর্জ্যের মাত্র ১২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে। বাকি প্রায় ২৫ হাজার ৫৫০ টন বর্জ্য শোধনাগারে প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে না। বিপুল পরিমাণ এই বর্জ্যের চূড়ান্ত ব্যবস্থাপনা কীভাবে হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান মোল্লা বলেন, ‘পচে যাওয়া বর্জ্য থেকে বিষাক্ত পানি বা লিচেট তৈরি হয়ে মাটির নিচে চলে যেতে পারে। এতে ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যশৃঙ্খলেও এর প্রভাব পড়তে পারে। ডায়রিয়া, চর্মরোগ, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ে।’
তিনি বর্জ্যের উৎসস্থল থেকেই পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
যশোর পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা উত্তম কুমার কুণ্ডু বলেন, ‘প্রতিনিয়ত যশোরের প্রতিটি ডাস্টবিন ও নির্ধারিত ময়লার স্থান থেকে বর্জ্য অপসারণ করা হচ্ছে। এরপরও কোথাও ময়লা পড়ে থাকলে বিষয়টি সরেজমিনে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পৌর প্রশাসক রফিকুল হাসান বলেন, ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে পৌর কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলা, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ এবং স্থায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
ডেপুটি সিভিল সার্জন নাজমুস সাদিক রাসেল বলেন, ‘অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও খোলা জায়গায় জমে থাকা বর্জ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এসব বর্জ্য থেকে জীবাণু, মাছি ও মশার বিস্তার ঘটতে পারে। এর ফলে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ে। জমে থাকা বর্জ্য ও পানি ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।’
তিনি বর্জ্য দ্রুত অপসারণ, ড্রেন পরিষ্কার রাখা এবং বাড়ি থেকেই বর্জ্য পৃথক করে নির্ধারিত স্থানে দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
কোটি কোটি টাকা ব্যয়, শত শত পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও একাধিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো থাকার পরও যদি শহরের রাস্তাঘাটে নিয়মিত ময়লার স্তূপ পড়ে থাকে, তাহলে পুরো ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। যশোরবাসীর প্রত্যাশা, শুধু বর্জ্য অপসারণ নয়, উৎস থেকে সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও চূড়ান্ত ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.