মো. ইব্রাহীম মিঞা, দিনাজপুর প্রতিনিধি
দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার পলিপ্রয়াগপুর ইউনিয়নের চকবসন্ত মোন্নাপাড়া গ্রামের মমিনুর ইসলাম। একসময় গাছ কাটা ও বিক্রি এবং কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করলেও গত পাঁচ বছর ধরে আখ চাষ ও আখের রস বিক্রি করে স্বাবলম্বী হয়েছেন তিনি। নিজের জমিতে আখ চাষ করে সেই আখ থেকেই রস তৈরি করে বিক্রি করছেন। তাঁর এই উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন ছেলে আরিফুল ইসলাম। মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেও চাকরির পেছনে না ছুটে বাবার ব্যবসায় সময় দিচ্ছেন তিনি।
মমিনুর ইসলাম মৃত মনসুর আলীর ছেলে। প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি পুরোনো ভ্যানে আখের রস তৈরির মেশিন কিনে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। ক্রেতাদের চাহিদা বাড়তে থাকলে পরবর্তীতে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ব্যয়ে আধুনিক মেশিন কিনেছেন। মেশিনটির বিশেষত্ব হলো, হাতের সরাসরি স্পর্শ ছাড়াই আখ থেকে রস বের করা যায়। পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে রস পরিবেশনের কারণে স্থানীয়দের কাছে তাঁর দোকানটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
প্রথমে ১২ শতক জমিতে আখ চাষ শুরু করেন মমিনুর। পরে জমির পরিমাণ বাড়িয়ে ১৬ শতক এবং বর্তমানে প্রায় ৩৬ শতক জমিতে লাল গেন্ডারি জাতের আখ চাষ করছেন তিনি। নিজের জমি থেকে আখ সংগ্রহ করে বাড়িতে নিয়ে পরিষ্কার ও প্রক্রিয়াজাত করে রস তৈরি করেন। এ কাজে স্ত্রী, ছেলের বউ ও ছেলে আরিফুল ইসলাম তাঁকে সহযোগিতা করেন।
মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করার পরও চাকরির পেছনে না ছুটে বাবার পাশে দাঁড়িয়েছেন আরিফুল ইসলাম। তিনি নিয়মিত আখ পরিষ্কার, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রস তৈরির কাজে সহযোগিতা করেন। এতে বাবার কাজ সহজ হওয়ার পাশাপাশি পারিবারিক উদ্যোগটিও আরও গতিশীল হয়েছে।
মমিনুর ইসলাম বলেন, আগে তিনি অন্যের কাছ থেকে আখ কিনে রস বিক্রি করতেন। পরে নিজের জমিতে আখ চাষ শুরু করেন। বর্তমানে নিজের জমিতে উৎপাদিত আখ দিয়েই রস বিক্রি করছেন। প্রতিদিন তাঁর প্রায় ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আখের রস বিক্রি হয়। বিশেষ করে শুক্রবার বিক্রি বেড়ে যায়।
আখের রস বিক্রির পাশাপাশি আখের কোনো অংশই অপচয় হতে দেন না মমিনুর। রস বের করার পর অবশিষ্ট ছোবড়া রোদে শুকিয়ে গৃহস্থালির রান্নার কাজে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেন। আখের আগার পাতা ব্যবহার করা হয় গৃহপালিত পশুর খাদ্য হিসেবে। আবার আখের অংশ থেকেই পরবর্তী চাষের জন্য বীজ সংগ্রহ করা হয়। এতে উৎপাদনের বিভিন্ন অংশ কাজে লাগিয়ে বাড়তি খরচও কমিয়ে আনছেন তিনি।
মোন্নাপাড়া ব্রিজ এলাকায় তাঁর দোকানে প্রতিদিনই ভিড় করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রচণ্ড গরমে ক্লান্ত পথিক, ভ্যান ও অটোরিকশাচালক, মোটরসাইকেল আরোহীসহ স্থানীয় বাসিন্দারা এখানে এসে আখের রস পান করেন। আধুনিক মেশিনে হাতের স্পর্শ ছাড়াই রস তৈরি এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে।
স্থানীয় কয়েকজন ক্রেতা জানান, মমিনুর ইসলামের দোকানের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন এবং তাঁর ব্যবহারও আন্তরিক। এ কারণে তাঁরা নিয়মিত এখান থেকে আখের রস পান করেন।
মমিনুর ইসলাম বলেন, পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতাই তাঁর ব্যবসাকে এগিয়ে নিতে বড় ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে ছেলে আরিফুল ইসলাম মাস্টার্স শেষ করার পর থেকে নিয়মিত বাবার সঙ্গে সময় দিচ্ছেন। নিজের জমিতে আখ চাষ এবং সেই আখ দিয়ে রস বিক্রির মাধ্যমে বর্তমানে ভালোভাবেই সংসার চালাতে পারছেন তিনি।
এদিকে শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরির অপেক্ষায় না থেকে বাবার পাশে দাঁড়িয়ে পারিবারিক উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়া আরিফুল ইসলামের ভূমিকা যেমন প্রশংসনীয়, তেমনি কৃষিভিত্তিক ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে মমিনুর ইসলামের স্বাবলম্বী হওয়ার গল্পও স্থানীয়ভাবে অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
বিরামপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ আখতারুজ্জামান বলেন, আখ একটি লাভজনক ফসল। যে কেউ আখ চাষ করে সফল হতে পারেন। এর উৎপাদন খরচও তুলনামূলক কম। বর্তমানে উপজেলায় প্রায় এক হেক্টর জমিতে আখ চাষ হচ্ছে। পলিপ্রয়াগপুর ইউনিয়নের মমিনুর ইসলাম নিজের প্রায় এক বিঘা জমিতে আখ চাষ করে উদ্যোক্তা হিসেবে সেই আখের রস বিক্রি করে সফলতা অর্জন করেছেন। পরিকল্পিতভাবে আখ চাষ করলে যে কেউ এ ফসলের মাধ্যমে সহজেই স্বাবলম্বী হতে পারেন।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.