রাসেল আহমেদ, খুলনা প্রতিনিধি
রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ হওয়ার ছয় বছর পর বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আবারও চালু হচ্ছে খুলনার প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল ও স্টার জুট মিল। বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) কাছ থেকে সম্প্রতি মিল দুটি লিজ নিয়েছে হ্যামকো গ্রুপ ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। এতে দুই প্রতিষ্ঠানে অন্তত ৬ হাজার ৩৯১ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
দীর্ঘদিন শ্রমিকশূন্য থাকা খুলনার খালিশপুর শিল্পাঞ্চলের এ দুই মিলকে ঘিরে নতুন করে কর্মচাঞ্চল্য ফেরার আশা করছেন স্থানীয়রা।
লিজগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, প্রচলিত পাটজাত পণ্যের পাশাপাশি আধুনিক ও বহুমুখী পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলে উন্নতমানের লিথিয়াম ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক যানবাহন উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে স্টার জুট মিলে ব্যাগ, জুতা, মশারি ও ছাতাসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
জানা গেছে, ১৯৫৪ সালে খুলনা মহানগরের খালিশপুরে ভৈরব নদীর তীরে ৫০ একর জমির ওপর প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল প্রতিষ্ঠিত হয়। ভৈরব নদের অপর পাড়ে দিঘলিয়া উপজেলায় ৫৬ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠা করা হয় স্টার জুট মিল।
ক্রমাগত লোকসানের কারণে ২০২০ সালের ২৫ জুন তৎকালীন সরকার প্লাটিনাম জুবিলি ও স্টার জুট মিলসহ দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। পরে ২ জুলাই পাটকল বন্ধ এবং গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের আওতায় শ্রমিকদের অবসায়নের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে দুই মিলের হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন।
বন্ধের সময় প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলে ৯৫৭টি এবং স্টার জুট মিলে ৭৭০টি তাঁত ছিল। দীর্ঘ ছয় বছর বন্ধ থাকায় অধিকাংশ তাঁত এখন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বর্তমানে প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলে ৩৮ জন কর্মকর্তা ও ৮২ জন কর্মচারীসহ ১২০ জন এবং স্টার জুট মিলে ১৯ জন কর্মকর্তা ও ৮১ জন কর্মচারীসহ ১০০ জন কর্মরত রয়েছেন।
বিজেএমসি সূত্র জানায়, প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল হ্যামকো গ্রুপ এবং স্টার জুট মিল প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কাছে লিজ দেওয়া হয়েছে। প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলে প্রায় ২১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে হ্যামকো গ্রুপ। সেখানে অন্তত ১ হাজার ১৫৩ জনের কর্মসংস্থান হবে। প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাব্য বার্ষিক টার্নওভার ধরা হয়েছে প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে স্টার জুট মিলে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। সেখানে ৫ হাজার ২৩৮ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে জানানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাব্য বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।
হ্যামকো কোম্পানি লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক (এইচআর অ্যান্ড অ্যাডমিন) মো. মাইনুদ্দীন সানা বলেন, চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর বিজেএমসির কাছ থেকে তিন মাস সময় পাওয়া যাবে। সবকিছু প্রস্তুত করতে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
তিনি বলেন, মিলটিতে আধুনিক পাটজাত পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি উন্নতমানের লিথিয়াম ব্যাটারি ও ইলেকট্রিক ভেহিকল উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
স্টার জুট মিলের মহাব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, মিলটির ৫৬ একর জমির মধ্যে ৪৬ একর জমি ও অবকাঠামো ইজারা নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সেখানে ব্যাগ, জুতা, মশারি ও ছাতাসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা হবে। ভবিষ্যতে একটি পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। মিলটি পুরোপুরি চালু হলে কমপক্ষে পাঁচ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে।
তবে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পাটকল রক্ষায় সম্মিলিত নাগরিক পরিষদ খুলনার আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা। তিনি বলেন, ১৯৯৩ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রাইভেটাইজেশন বোর্ড ৭৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণ করেছিল। এর অধিকাংশই টেকেনি। অনেক প্রতিষ্ঠান লিজের অর্থও সরকারকে পরিশোধ করেনি। বরং স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ী মহল এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, এবারও একই ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হবে না—এর নিশ্চয়তা কী?
কুদরত-ই-খুদার ভাষ্য, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের আগে সরকারের উচিত ছিল লোকসানের প্রকৃত কারণ নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে সরকারি উদ্যোগেই মিলগুলো পুনরায় চালু করা।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.