গিয়াস উদ্দিন মিয়া, গৌরনদী (বরিশাল) প্রতিনিধি
‘নামে নামে জমে টান’—বরিশালের গৌরনদীতে প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের গেজেট ও মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি নিয়ে এমনই জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। একই গেজেট ও সনদের দাবিদার হয়েছেন দুই ব্যক্তি। বিষয়টি নিয়ে অভিযোগের পর তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দায়িত্ব পাওয়ার প্রায় ১০ মাসেও তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার ছেলে মো. নাসির।
সরিকল গ্রামের প্রয়াত নুরুল ইসলাম পেশায় রিকশাচালক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি রণাঙ্গনে অংশ নেন এবং পরবর্তীতে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হন। জীবদ্দশায় তিনি মুক্তিযোদ্ধা ভাতাসহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন। ২০২০ সালের ১৭ আগস্ট তিনি মারা গেলে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।
প্রয়াত নুরুল ইসলামের ছেলে মো. নাসিরের দাবি, তার বাবার গেজেট নম্বর ৩৪৯৩। তবে গেজেটে তার বাবার পিতার নাম আমজাদ আলী হাওলাদার হাওলাদারের পরিবর্তে মোসলেম উদ্দিন মুন্সী লেখা রয়েছে। এ ভুল সংশোধনের জন্য তার বাবা ২০০৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর এবং ২০১৮ সালের ২৯ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছিলেন। তবে তা সংশোধন হয়নি।
নাসির জানান, তার বাবার মৃত্যুর পর এমআইএসের কাগজপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি দেখতে পান, সেখানে তার বাবার ছবির পরিবর্তে অন্য একজনের ছবি রয়েছে। পরে জানতে পারেন, মুলাদী উপজেলার গাছুয়া এলাকার নুরুল ইসলাম নামে আরেক ব্যক্তি ওই গেজেট ও সনদের দাবিদার হয়েছেন।
নাসিরের অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিপিন চন্দ্র বিশ্বাসের কার্যালয়ে তদন্ত হয়। সেখানে মুলাদীর নুরুল ইসলাম নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি না করার বিষয়ে মুচলেকা দিয়েছিলেন এবং ভাতা ত্যাগের কথা জানিয়েছিলেন। তবে পরবর্তীতে তিনি আবার নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেন এবং বর্তমানে ভাতা পাচ্ছেন বলে অভিযোগ নাসিরের।
তিনি আরও জানান, ২০২৫ সালে বিষয়টি পুনঃতদন্তের জন্য আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেন। কিন্তু দায়িত্ব পাওয়ার প্রায় ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্ত শুরু হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
নাসির বলেন, “আমি ট্যানারিতে কাজ করে সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালাই। আদালতে যাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য আমার নেই। একজন প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধার সম্মান রক্ষায় বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত করে দ্রুত সমাধান চাই।”
স্থানীয় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরিকল গ্রামের প্রয়াত নুরুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের সময় রণাঙ্গনে ছিলেন। তাদের দাবি, মুলাদীর নুরুল ইসলাম গৌরনদী এলাকায় যুদ্ধ করেছেন—এমন তথ্য তাদের জানা নেই। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সরিকল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন মোল্লা বলেন, “সরিকল গ্রামের প্রয়াত নুরুল ইসলাম একজন প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা। অপরদিকে জীবিত নুরুল ইসলামের বাড়ি মুলাদীর গাছুয়া এলাকায়। তিনি এ এলাকায় যুদ্ধ করেছেন বলে কখনো শুনিনি। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা উচিত।”
তবে প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার ছেলে নাসিরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মুলাদীর নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, “আমি প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা। অন্য কারও গেজেট ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধা হইনি। আমার গেজেট দিয়ে অন্য একজন ভাতা উত্তোলন করতেন। হাইকোর্টে রিট করার পর এখন আমি আমার মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি অনুযায়ী ভাতা পাচ্ছি।”
তবে একই গেজেট ও সনদ নিয়ে দুই ব্যক্তির দাবির বিষয়টি এবং তদন্তে দীর্ঘসূত্রতার কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার ছেলে নাসির বিষয়টির দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন এবং তার বাবার মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মান অক্ষুণ্ন রাখার দাবি জানিয়েছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.