মো. মিজানুর রহমান, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি
একটি সাইনবোর্ড, টিনের একটি ঘর আর সরকারি কাগজপত্রে শিক্ষার্থী-শিক্ষকের হিসাব—সবই আছে। কিন্তু বাস্তবে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কিংবা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা কার্যক্রমের দৃশ্যমান চিত্র নেই। এমন অভিযোগ উঠেছে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার শহীদবাগ ইউনিয়নের সাব্দী গ্রামের ‘শহীদবাগ বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়’ নিয়ে।
২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠার দাবি করা বিদ্যালয়টির কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, এখানে ১৩০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে এবং একাধিক শিক্ষক কর্মরত। তবে শনিবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে নিয়মিত ক্লাস, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কিংবা বিশেষায়িত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার দৃশ্য চোখে পড়েনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাগজপত্রে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম সচল দেখানো হলেও বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। এমনকি প্রশাসনিক পরিদর্শনের সময় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি দেখাতে আশপাশের এলাকা থেকে সাধারণ শিশু এনে শ্রেণিকক্ষে বসানোর অভিযোগও করেছেন তাঁরা।
শনিবার সকালে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার পাশে নিচু জায়গায় একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘর। বাইরে রয়েছে বিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড। তবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষা উপকরণ, প্রশিক্ষণসামগ্রী কিংবা নিয়মিত পাঠদানের দৃশ্যমান পরিবেশ চোখে পড়েনি।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বললে তাঁরাও বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস হয় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের দাবি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতিও তাঁরা দেখতে পান না।
অথচ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের দাবি, প্রতিষ্ঠানে ১৩০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে এবং বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলছে। তবে সরেজমিনে গিয়ে এসব দাবির দৃশ্যমান সত্যতা পাওয়া যায়নি।
বিদ্যালয়টি নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে প্রশাসনিক পরিদর্শনকে কেন্দ্র করে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, সহকারী কমিশনার (ভূমি) অংকন পাল বিদ্যালয় পরিদর্শনে আসবেন—এমন খবর পাওয়ার পর আশপাশের এলাকা থেকে তড়িঘড়ি করে কিছু সাধারণ শিশু এনে শ্রেণিকক্ষে বসানো হয়।
তাঁদের অভিযোগ, পরিদর্শকদের সামনে বিদ্যালয়ে নিয়মিত শিক্ষার্থী রয়েছে—এমন একটি চিত্র তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই শিশুদের আনা হয়েছিল। তবে ওই দিন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কোনো শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল না বলেও দাবি করেন তাঁরা।
স্থানীয়দের আরও দাবি, পরিদর্শন শেষ হওয়ার পর ওই শিশুদের আর বিদ্যালয়ে দেখা যায়নি। ফলে পরিদর্শনের সময় কৃত্রিমভাবে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি দেখানোর চেষ্টা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) অংকন পাল বলেন, পরিদর্শনকালে বিদ্যালয়ের বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। অন্যস্থান থেকে শিশু এনে পরিদর্শকদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হয়ে থাকলে তা চরম অন্যায়। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়টি সরকারি স্বীকৃতি, এমপিওভুক্তি কিংবা অনুদানের আওতায় আসবে—এমন আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন পদে নিয়োগের নামে চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেফালি খাতুন ও তাঁর স্বামী প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আব্দুল হাইয়ের নাম উঠে এসেছে।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, বিভিন্ন পদে নিয়োগের কথা বলে চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়টি ভবিষ্যতে সরকারি সুবিধা পাবে—এমন আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ তাঁদের।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা লেনদেনের প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে প্রধান শিক্ষকের স্বামীর দায়িত্বে থাকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের অভিযোগ, স্বামী-স্ত্রীর প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিদ্যালয়ের পরিচালনা ও নিয়োগ কার্যক্রমে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেফালি খাতুন অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নিয়ে কাজ করা কঠিন হলেও তাঁরা তাঁদের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর স্বামী সভাপতি থাকার বিষয়টিও সবার সম্মতিতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে প্রশাসনিক পরিদর্শনের দিন বাইরে থেকে শিশু এনে শ্রেণিকক্ষে বসানোর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মনোনীত ব্যক্তি হিসেবে দাবি করা আব্দুল হাই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে বলেন, তিনি নিয়মতান্ত্রিকভাবেই শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।
উপজেলা ভারপ্রাপ্ত সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আনছার আলী বলেন, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পাপিয়া সুলতানা বলেন, বিশেষায়িত বিদ্যালয়ের নামে কোনো ধরনের অনিয়ম, ভুয়া শিক্ষার্থী প্রদর্শন কিংবা নিয়োগ বাণিজ্যের সুযোগ নেই। অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। নিরপেক্ষ তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, প্রকৃত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সংখ্যা, পরিচালনা কমিটি, নিয়োগ প্রক্রিয়া, অর্থ লেনদেন এবং সরকারি স্বীকৃতি বা অনুদানের বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রশাসনিক পরিদর্শনের সময় বাইরে থেকে শিশু এনে উপস্থিতি দেখানোর অভিযোগেরও তদন্ত দাবি করেছেন তাঁরা।
স্থানীয় বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম বলেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা ও পুনর্বাসনের জন্য প্রতিষ্ঠিত কোনো বিদ্যালয়ের কার্যক্রম যদি কাগজপত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়মের বিষয় নয়; এর সঙ্গে শিশুদের শিক্ষার অধিকার ও সরকারি ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতার প্রশ্নও জড়িত।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে শুধু সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নয়, বিশেষায়িত শিক্ষার নামে ভবিষ্যতে এ ধরনের ‘কাগজের বিদ্যালয়’ গড়ে ওঠার পথও বন্ধ করবে প্রশাসন।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.