দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা নদীর অব্যাহত ভাঙনে একের পর এক ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। নদীর প্রবল স্রোতে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও চলাচলের সড়কও ভেঙে পড়েছে। এতে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের কয়েক হাজার মানুষ।
উপজেলার চিলমারী ইউনিয়নের সীমান্তঘেঁষা উদয়নগর, আতারপাড়া ও ডিগ্রীরচর এলাকায় গত এক সপ্তাহ ধরে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে ফসলি জমি, বসতবাড়ি, চলাচলের রাস্তা ও বৈদ্যুতিক খুঁটির একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়েছে। পদ্মার প্রবল স্রোতে একের পর এক ঘরবাড়ি ও বৈদ্যুতিক খুঁটি নদীতে ধসে পড়ছে। ভাঙনের কারণে ওই এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দাদের ভাষ্য, গত দুই সপ্তাহ ধরে পদ্মায় পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙন শুরু হয়। তবে গত এক সপ্তাহে স্রোতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তাদের দাবি, রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আলাইপুর এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণের কারণে পদ্মার স্রোতের চাপ দৌলতপুরের এই অংশে বেড়েছে। তবে এ দাবির স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ভাঙনের শিকার স্থানীয়রা জানান, প্রায় এক মাস ধরে কমবেশি ভাঙন চললেও সাম্প্রতিক কয়েক দিনে এর তীব্রতা ব্যাপক বেড়েছে। এতে অনেক পরিবার বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
এর আগে গত জুলাই মাসেও উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের মাজদিয়াড় ও কোলদিয়াড় এলাকায় ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছিল। মাত্র ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙনে শতাধিক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। নদীর ভাঙনে ওই এলাকার প্রায় ৫০০ বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনে।
উদয়নগর, আতারপাড়া ও ডিগ্রীরচরের বাসিন্দারা জানান, সীমান্তঘেঁষা দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা এমনিতেই দুর্বল। প্রতিবছর বন্যা ও নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ও জমিজমা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পানি কমে গেলে চর জেগে উঠলে সেখানে আবার চাষাবাদ শুরু করেন তারা। কিন্তু ভাঙনের কারণে প্রতিবছর নতুন করে বসতভিটা ও ফসলি জমি হারাতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর পদ্মার ভাঙনে উদয়নগর বিজিবি ক্যাম্পও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ভাঙন ঠেকাতে বিভিন্ন সময়ে জিও ব্যাগসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও ক্যাম্পটি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে কয়েকশ বিঘা জমি ও অসংখ্য ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল সরকার বলেন, “উদয়নগর, আতারপাড়া ও ডিগ্রীরচরের বসতভিটা, চলাচলের রাস্তা, ফসলি জমি ও বৈদ্যুতিক খুঁটি নদীগর্ভে চলে গেছে। এক সপ্তাহ ধরে ভাঙন চলছে, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর তীব্রতা অনেক বেড়েছে। নদীর স্রোত সবকিছু ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে কয়েক দিনের মধ্যেই আতারপাড়া, উদয়নগর ও ডিগ্রীরচর গ্রামের বড় অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।”
চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান বলেন, পদ্মায় নতুন করে পানি প্রবেশ করায় প্রবল স্রোত সৃষ্টি হয়েছে। এতে উদয়নগর, ডিগ্রীরচর ও আতারপাড়া এলাকার বাড়িঘর, ফসলি জমি ও বৈদ্যুতিক খুঁটি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, প্রায় এক সপ্তাহ আগে কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে ভাঙনকবলিত এলাকায় বৈঠক করা হয়েছে। সীমান্তঘেঁষা দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় সেখানে জরুরি ভিত্তিতে কাজ করা সহজ নয়। নতুন করে পদ্মায় পানি প্রবেশ করায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে কথা বলে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসাউদ্দৌলা বলেন, তিনি মাত্র দুই দিন আগে কুষ্টিয়ায় যোগ দিয়েছেন। তাই ভাঙনকবলিত এলাকা ও পানির পরিস্থিতি সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত অবগত নন। অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বন্যার পানি ও ভাঙন পরিস্থিতি সম্পর্কে পরে জানানো হবে।
ভুক্তভোগীদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পদ্মার ভাঙনে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। তারা জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধ, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন এবং দুর্গম চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.