নান্দাইল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে চার মাস আগে রাশিয়ায় পাড়ি দিয়েছিলেন ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার খারুয়া গ্রামের ২৫ বছর বয়সী মামুন মিয়া। ইলেকট্রনিক শ্রমিকের চাকরি ও ভালো বেতনের আশ্বাসে বিদেশে গেলেও শেষ পর্যন্ত তাকে যুদ্ধের ময়দানে পাঠানো হয় বলে পরিবারের অভিযোগ। ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় মামুন নিহত হয়েছেন বলে স্বজনদের কাছে খবর এসেছে।
মামুন খারুয়া গ্রামের মৃত আবুল কাশেমের ছেলে। তার স্ত্রী মহিমা আক্তার ও দুই সন্তান রয়েছে। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে শোকে কাতর মা রোকেয়া খাতুন। স্বামীকে হারিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছেন মহিমা।
পারিবারিক সূত্র ও স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘জাবাল-এ নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ নামের একটি এজেন্সির মাধ্যমে প্রায় চার মাস আগে রাশিয়ায় যান মামুন। তার সঙ্গে আরও প্রায় ৩০ জনের একটি দল ছিল। তাদের ইলেকট্রনিক শ্রমিকসহ বিভিন্ন কাজে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
তবে স্বজনদের অভিযোগ, রাশিয়ায় পৌঁছানোর মাত্র চার দিনের মাথায় পরিস্থিতি বদলে যায়। এজেন্সি ও সংশ্লিষ্ট মানবপাচারকারী চক্র মামুনসহ পুরো দলটিকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। পরে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয় বলে দাবি পরিবারের।
মামুনের সঙ্গে রাশিয়ায় থাকা ঝিনাইদহের রাজন মিয়া গত মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দেশে ফিরে স্বজনদের জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় মামুন নিহত হয়েছেন। ওই হামলায় রাজন নিজেও গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে দেশে ফেরেন তিনি।
তবে মামুনের মরদেহ বর্তমানে কোথায় রয়েছে, কী অবস্থায় আছে এবং সেটি দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া কী—এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পায়নি পরিবার।
স্বজনরা জানান, মামুনের সঙ্গে পরিবারের সর্বশেষ কথা হয় গত ২৬ আগস্ট। ওই সময় মামুন জানিয়েছিলেন, পরিবারের সঙ্গে কথা বলার জন্য তাকে প্রায় আট কিলোমিটার পথ হেঁটে এসে ওয়াই-ফাই সংযোগ নিতে হয়েছে। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
মামুনের স্ত্রী মহিমা আক্তার বলেন, “দুই বাচ্চা নিয়ে এখন আমি কীভাবে সংসার চালাব? মরদেহটা কীভাবে দেশে আনব, তা-ও তো জানি না।” স্বামীর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
বুধবার দুপুরে মামুনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙা ঘরের সামনে উঠানে বসে কান্না করছেন তার মা রোকেয়া খাতুন ও স্ত্রী মহিমা আক্তার। খবর পেয়ে আশপাশের লোকজনও বাড়িতে ভিড় করেন।
মা রোকেয়া খাতুন বলেন, “সংসারের সচ্ছলতা ফেরানোর জন্য চার মাস আগে সাড়ে ৮ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ ও ধার করে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছি। এখনো কারও টাকা শোধ করতে পারিনি। সমিতির লোকজন এসে ঘুরে যাচ্ছে। একমাত্র সন্তানের এমন করুণ পরিণতি হবে ভাবতেও পারি না। দুইটা নাতিকে কীভাবে বড় করব, তাও বুঝতেছি না।”
নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, ভালো বেতন ও চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট চক্রটি বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়েছে। এভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও তাদের দাবি। তারা ‘জাবাল-এ নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ ও ঘটনার সঙ্গে জড়িত কথিত মানবপাচারকারীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে মামুনের মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং তার মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্বজনরা।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. জামাল উদ্দিন বাচ্চু বলেন, “মামুন দরিদ্র পরিবারের সন্তান। পরিবারের সচ্ছলতার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে ড্রোন হামলায় তার মৃত্যুর খবর অত্যন্ত দুঃখজনক।”
নান্দাইল মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, “এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাইনি। পরিবারের কেউ থানায় অভিযোগ দিলে আমরা আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।”
নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা জান্নাত বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
মামুনের মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নই ভেঙে যায়নি; বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি শ্রমিকদের যুদ্ধের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। এখন পরিবারের একমাত্র দাবি—ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং মামুনের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.