নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর
নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনে পশুখাদ্যের (ফিড) মান নিয়ন্ত্রণে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া যাবে না বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। একই সঙ্গে প্রান্তিক খামারিদের উৎপাদন খরচ কমিয়ে টিকিয়ে রাখতে সহজ শর্তে ঋণ এবং কৃষক কার্ডের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় গাজীপুরের জয়দেবপুরে পিটিআই অডিটোরিয়ামে ‘নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন, ২০১০ বাস্তবায়ন ও মান নিয়ন্ত্রণ জোরদারকরণ’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর এ কর্মশালার আয়োজন করে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনের প্রথম শর্ত হচ্ছে প্রাণীকে নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য খাওয়ানো। একটি প্রাণীকে নিরাপদ ও মানসম্মত ফিড খাওয়াতে পারলে প্রাণীটি নিরাপদ থাকবে। আর নিরাপদ প্রাণী থেকেই আমরা নিরাপদ মাংস, ডিম ও দুধ পাব।”
তিনি বলেন, জনগণের জন্য নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ নিশ্চিত করতে ফিডের মান নিয়ন্ত্রণে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া যাবে না। প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে অযথা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যাবে না। উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপত্তা, মান ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে খামারিদের টিকিয়ে রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রান্তিক খামারিদের জন্য সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, উৎপাদন খরচ কমিয়ে প্রান্তিক খামারিদের টিকিয়ে রাখতে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হবে। সব খামারিকে কৃষক কার্ডের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের জন্য ব্যাংক ঋণ সহজ করার উদ্যোগও নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “প্রান্তিক খামারিরা সমৃদ্ধ হলে প্রাণিসম্পদ খাত শক্তিশালী হবে, আর খামারিরা শক্তিশালী হলে সমৃদ্ধ হবে বাংলাদেশ।”
দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিল্প ও খামার ব্যবস্থাপনায় কোনো কিছু যেন অপচয় না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। অপচয় কমিয়ে উৎপাদন ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখা গেলে উৎপাদক ও ভোক্তা—উভয়ের জন্যই লাভজনক পরিবেশ তৈরি হবে।
বাংলাদেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সমৃদ্ধ করতে দেশের বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের ২০ কোটি মানুষের কর্মক্ষমতাকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
মাদক প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মাদক বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা। যুবসমাজকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে এর বিস্তার রোধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া যাবে না।
কর্মশালার উন্মুক্ত আলোচনায় জেলার বিভিন্ন এলাকার খামারিরা তাদের নানা সমস্যা তুলে ধরেন। তারা বলেন, উৎপাদিত পণ্যের মূল্য নির্ধারণে খামারিদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও অনেক সময় তারা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন।
খামারিরা আরও জানান, অতিরিক্ত তাপমাত্রার সময়ে সময়মতো বিদ্যুৎ না পাওয়া উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় সমস্যা তৈরি করছে। পাশাপাশি করপোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে মুরগির বাচ্চা সংগ্রহের ক্ষেত্রেও বৈষম্যের অভিযোগ তোলেন তারা। প্রান্তিক খামারিদের তুলনামূলক কম ওজনের মুরগির বাচ্চা দেওয়া হলেও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে মোরগের বাচ্চা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তারা। এ বৈষম্য দূর করে সব খামারির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানান খামারিরা।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ফিডের মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে মানসম্পন্ন পোল্ট্রি উৎপাদন সম্ভব হবে। মানসম্মত উৎপাদন বাড়াতে পারলে দেশে হাজার হাজার কোটি টাকার পোল্ট্রি ও মাংস উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। উৎপাদন বাড়লে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রও আরও সম্প্রসারিত হবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহজামান খান বলেন, নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনের জন্য মানসম্মত ফিড নিশ্চিত করার পাশাপাশি খামারিদের বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তাঁর পরিচালনায় কর্মশালায় উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
স্বাগত বক্তব্য দেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সম্প্রসারণ পরিচালক ড. বেগম শামছুন নাহার আহম্মদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গাজীপুরের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. হারুন অর রশিদ।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া সভাপতির বক্তব্যে নিরাপদ উৎপাদন ও পরিবেশ সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন। শিল্প ও খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ক্ষতিকর বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহজামান খান, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এবং গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন পিপিএম (বার)।
এ ছাড়া জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তা, প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, খামারি ও সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা কর্মশালায় অংশ নেন।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, নিরাপদ প্রাণিজ আমিষের শুরু খামার থেকেই। আর খামারে নিরাপদ প্রাণী নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো নিরাপদ ও মানসম্মত ফিড। তাই ফিডের কাঁচামাল থেকে উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে নিরাপদ মাংস, ডিম ও দুধ উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.