হুমায়ন কবির মিরাজ, বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায়। জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক নৌপথে পরিবহন ব্যয় বাড়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তি দামের সঙ্গে সমন্বয় করতে সরকার গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে। তেলের দাম বাড়ার পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আমদানি করা পণ্য পরিবহনে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া রুটভেদে ৪ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একই সঙ্গে পণ্যবাহী যানবাহনের সংকটও তৈরি হয়েছে। ফলে বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের পাশাপাশি সময়মতো পণ্য খালাস ও সরবরাহ নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন আমদানিকারকরা।
বেনাপোলের পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, টঙ্গী ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন রুটে পণ্য পরিবহনের ভাড়া বেড়েছে। এর মধ্যে বেনাপোল-ঢাকা রুটে আগে একটি ট্রাকের ভাড়া ছিল ২০ থেকে ২১ হাজার টাকা। বর্তমানে নেওয়া হচ্ছে ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা। চট্টগ্রাম রুটে ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকার ভাড়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ থেকে ৩৬ হাজার টাকা পর্যন্ত।
গাজীপুর, টঙ্গী ও নারায়ণগঞ্জ রুটেও বেড়েছে পরিবহন ব্যয়। এসব গন্তব্যে আগে যেখানে প্রায় ২২ হাজার টাকা ভাড়া নেওয়া হতো, এখন তা ২৬ থেকে ২৭ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। ফলে আমদানি করা পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠাতে ব্যবসায়ীদের বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিই নয়, ট্রাকের টায়ার ও যন্ত্রাংশের দাম, ফেরি ভাড়া এবং টোলসহ অন্যান্য খরচও বেড়েছে। আবার অনেক সময় ঢাকা বা অন্যান্য গন্তব্য থেকে ফেরার পথে ট্রাকের জন্য পর্যাপ্ত পণ্য পাওয়া যায় না। ফলে একমুখী যাত্রার বাড়তি ব্যয়ও মূল ভাড়ার সঙ্গে সমন্বয় করতে হচ্ছে।
বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আজিম উদ্দিন গাজী বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি ফেরি ও টোলের খরচ বেড়েছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্য নিয়ে যাওয়ার পর ফেরার পথে পর্যাপ্ত পণ্য না পাওয়ায় ট্রাক মালিকদের বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে। এ কারণে পরিবহন ভাড়া বেড়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিদিন বেনাপোল থেকে প্রায় ২০০টি কাভার্ড ভ্যানসহ প্রায় ৫০০ পণ্যবাহী ট্রাক দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যায়। তবে বর্তমানে ট্রাকের সংকট ও বাড়তি ভাড়ার কারণে স্বাভাবিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বেনাপোল ল্যান্ড পোর্ট ইমপোর্টার অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আলহাজ মতিয়ার রহমান বলেন, বেনাপোল দিয়ে প্রতিদিন ৩৫০ থেকে ৪০০ ট্রাক পণ্য আমদানি এবং ১০০ থেকে ১৫০ ট্রাক পণ্য রপ্তানি হয়। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় পণ্য পাঠাতে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। ট্রাক মালিকরা রুটভেদে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়িয়েছেন। এতে ব্যবসায়ীদের খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে আমদানি করা পণ্যের দামও বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব ভোক্তাদের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বেনাপোলের সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফ বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পরিবহন সংকট যুক্ত হওয়ায় ট্রাক ভাড়া স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেড়েছে। আমদানিকারকরা পণ্য এনে লাভ করার চেষ্টা করলেও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে লাভের পরিবর্তে লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দ্রুত নষ্ট হয় এমন পণ্য অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েই খালাস করতে হচ্ছে।
এদিকে বন্দর হ্যান্ডলিং শ্রমিকরাও ট্রাক সংকটের প্রভাব পড়ার কথা জানিয়েছেন। বেনাপোল স্থলবন্দরে দুই ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজে যুক্ত। শ্রমিকদের দাবি, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৬০০ ট্রাকের পণ্য লোড-আনলোড হলেও বর্তমানে তা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
বেনাপোল থেকে ঢাকায় পণ্য নিয়ে যাওয়া ট্রাকচালক জসীমউদ্দীন বলেন, বেনাপোল-ঢাকা-বেনাপোল যাতায়াতে একটি ট্রাকে প্রায় ১৫০ লিটার জ্বালানি প্রয়োজন হয়। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ায় শুধু জ্বালানি বাবদই প্রায় ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। এর সঙ্গে ফেরি, টোলসহ অন্যান্য ব্যয় রয়েছে। ফলে ট্রিপপ্রতি ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বাড়তি ভাড়া নিতে হচ্ছে।
আরেক ট্রাকচালক আতিয়ার রহমান বলেন, তিনি বেনাপোল থেকে কেমিক্যাল নিয়ে ভালুকা যাচ্ছেন। আগের তুলনায় এ পথে প্রায় ৪ হাজার টাকা বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর পরিবহন ব্যয় আরও বেড়েছে।
যশোর চেম্বার অব কমার্সের যুগ্ম সম্পাদক ও আমদানিকারক এজাজ উদ্দিন টিপু বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাক ভাড়াও বেড়েছে। এতে পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পণ্যের দামের ওপর পড়তে পারে।
সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও ফ্রেইট চার্জ বেড়েছে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাড়তি দামের চাপে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনও বড় অঙ্কের লোকসানে পড়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিরতার প্রভাব দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার বেনাপোলেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় কতটা বাড়ে এবং এর প্রভাব পণ্যের বাজারদরে কতটা পড়ে, সেটিই এখন ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের বড় উদ্বেগ।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.