নোয়াখালী প্রতিনিধি
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর কাজে রডের পরিবর্তে চিকন তার ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। নির্মাণকাজের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে ত্রুটিপূর্ণ কাজ ভেঙে নতুন করে করার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
এ ঘটনায় বেগমগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আবুল মনসুর আহমেদকে রাঙামাটি জেলায় বদলি করা হয়েছে। একই সঙ্গে উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলাম ও ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট মো. মহিন উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা প্রকৌশলী। বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠন করে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
এলজিইডি নোয়াখালী কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বেগমগঞ্জ উপজেলার জমিদারহাট থেকে সাহেবেরহাট ও হাসানহাট হয়ে মাইজদী আঞ্চলিক মহাসড়কে সংযোগ স্থাপনের জন্য ৪৯ দশমিক ০৬ মিটার দীর্ঘ আরসিসি ব্রিজটির নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর। শুরুতে মেসার্স হক ট্রেডার্স কাজটি পেলেও পরে কাজটি অন্যদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্মাণকাজের শুরু থেকেই বিভিন্ন অনিয়ম তাদের নজরে আসে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ দেওয়ার পর কিছু কাজ সংশোধন করা হলেও সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ও রেলিং নির্মাণে আবারও অনিয়ম করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, রাতের অন্ধকারে ফুটপাতের স্ল্যাব নির্মাণের সময় রডের পরিবর্তে চিকন তার এবং নিম্নমানের সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়। পরে দিনের বেলায় পথচারীরা পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে স্ল্যাবের কিছু অংশ ভেঙে পড়ে। একই ধরনের ত্রুটি সেতুর রেলিংয়েও দেখা যায়।
স্থানীয় যুবক অনিক বলেন, ‘ব্রিজটির কাজে শুরু থেকেই নানা অনিয়ম চলছে। আমরা বারবার এলজিইডিতে মৌখিকভাবে অভিযোগ করেছি। ঠিকাদারের লোকজনকেও অনিয়মের বিষয়টি দেখিয়েছি। এরপরও রডের পরিবর্তে চিকন তার দিয়ে কোনো রকমে কাজ করার চেষ্টা করা হয়েছে।’
আরেক স্থানীয় যুবক মো. হাসান সোহেল বলেন, ‘ব্রিজের পাইলিংয়ের সময় থেকেই নানা অনিয়ম আমাদের চোখে পড়ে। আমরা একাধিকবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরেছি। তারা দিনে কাজ না করে রাতের অন্ধকারে কাজ করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই সেতু দিয়ে বেগমগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ ও সদর উপজেলার চার ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করবে। জেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নমানের কাজের কারণে ভবিষ্যতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এর দায় কে নেবে?’
এ বিষয়ে এলজিইডি নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী যুগল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, সোমবার নির্মাণকাজ সরেজমিনে পরিদর্শন করেন এলজিইডির সুপারিনটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার, ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের প্রতিনিধিরা। পরিদর্শনে সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাবের কাজ নিম্নমানের এবং নকশা ও স্পেসিফিকেশনের বাইরে করা হয়েছে বলে দেখা যায়। একইভাবে রেলিংয়ের রডের কাজেও ত্রুটি পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, ‘আমি নিজে সরেজমিনে সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাবের নিম্নমানের কাজ দেখতে পাই। পরে ঠিকাদারের লোকজনকে সেগুলো দ্রুত ভেঙে অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী মঙ্গলবার এলজিইডির লোকজনের উপস্থিতিতে ত্রুটিপূর্ণ স্ল্যাবগুলো ভেঙে ফেলা হচ্ছিল। এ সময় উৎসুক লোকজন মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।’
নির্বাহী প্রকৌশলী আরও বলেন, স্ল্যাব ও রেলিংয়ের যেসব অংশে নিম্নমানের কাজ হয়েছে, সেগুলো ভেঙে অপসারণ করা হয়েছে। জেলা, উপজেলা ও ঢাকা থেকে একাধিক টিম বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদারকি করছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নকশা ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ত্রুটিগুলো সংশোধন করে সাত দিনের মধ্যে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে।
তবে মেসার্স হক ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ফজলুল হক বলেন, ‘কাজটি হক ট্রেডার্স পেলেও আমরা সরাসরি করছি না। আমাদের লাইসেন্সে সেনবাগের কয়েকজন মিলে কাজটি করছেন। তাদের মধ্যে একজনের নাম ফরহাদ।’
কাজের দায়িত্বে থাকা মো. ফরহাদ বলেন, ‘ব্রিজের কাজ আমরা শুরু থেকেই ভালোভাবে করে আসছি। কয়েকদিন আগে আমার অজান্তে ফুটপাতের স্ল্যাব ও রেলিংয়ের কাজে কিছু ত্রুটি ধরা পড়ে। বিষয়টি জানার পর এলজিইডির প্রকৌশলীদের উপস্থিতিতে যেসব অংশের কাজ ভালো হয়নি, সেগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে।’
এদিকে বেগমগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আবুল মনসুর আহমেদ বলেন, ‘আমি দুই মাস আগে বেগমগঞ্জে যোগ দিয়েছি। ব্রিজটির কাজে অনিয়মের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে যেসব জায়গায় কাজের মান খারাপ হয়েছে, সেগুলো ভেঙে অপসারণ করেছি। আজ (বৃহস্পতিবার) জানতে পেরেছি, আমাকে রাঙামাটি জেলায় বদলি করা হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলাম ও ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট মো. মহিন উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.