বান্দরবান প্রতিনিধি
পার্বত্য অঞ্চলে নতুন করে কোনো ইটভাটা চালু করতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী। তিনি বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট মেসেজ রয়েছে, পার্বত্য অঞ্চলে কোনো ইটভাটা আর চালু করতে দেওয়া হবে না।”
বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নে পরিবেশগত ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স ছাড়াই ইটভাটা পরিচালনার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড়ের পাদদেশ ও আশপাশের এলাকা থেকে মাটি সংগ্রহ করে এসব ভাটায় ইট তৈরি করা হচ্ছে। ইউনিয়নটিতে ৩২টি ইটভাটার মধ্যে ৮টির বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা এবং বাকি ২৪টির বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জরিমানা আদায় করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে ইটভাটা মালিকদের একাংশ বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন।
ইটভাটা মালিকদের কয়েকজনের দাবি, যেসব অভিযোগে ৮টি ভাটার বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা হয়েছে, একই ধরনের অভিযোগ অন্য ভাটাগুলোর বিরুদ্ধেও রয়েছে। তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কেন একই ধরনের কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এ প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
অভিযোগ রয়েছে, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স ছাড়াই বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় বছরের পর বছর ইটভাটা পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ করে লামার ফাইতং ইউনিয়নের পাগলীর আগা এলাকায় কয়েকটি ইটভাটার বিরুদ্ধে পাহাড় কাটাসহ বিভিন্ন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে গত ৮ সেপ্টেম্বর বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমেদ ভূইয়ার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের আদেশের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ধারা ১৫ অনুযায়ী সাত দিনের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ৩০ দিনের মধ্যে বান্দরবান জেলা প্রশাসনকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, পাহাড় কাটার ক্ষেত্রে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর সংশ্লিষ্ট ধারা, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া ইটভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে এবং লাইসেন্স ছাড়া ইট প্রস্তুত ও ভাটা পরিচালনার ক্ষেত্রে ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৩ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নের পরিবেশকর্মী ফরহাদ সজল বলেন, ইটভাটার বিরুদ্ধে প্রযোজ্য সব ধারায় নিয়মিত মামলা না করে শুধু পাহাড় কাটার অভিযোগে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে তুলনামূলক কম জরিমানা আদায় করা হচ্ছে। এতে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
লামা উপজেলা প্রেসক্লাবের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ও জিটিভির বিশেষ প্রতিনিধি ফরিদ উদ্দিন বলেন, “লামা উপজেলার একটি ছোট ইউনিয়নে ৩২টি ইটভাটা পরিচালনার যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিটি অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে কঠোর ও পূর্ণাঙ্গ আইনগত ব্যবস্থা না নিলে পাহাড় কাটার মতো পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করা সম্ভব হবে না।”
এদিকে গোপনীয়তার শর্তে কয়েকজন ইটভাটা মালিক অভিযোগ করেছেন, যেসব ভাটার বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হয়নি, তাদের কাছ থেকে প্রতিটি ইটভাটার জন্য ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা করে পরিবেশ অধিদপ্তরকে দেওয়ার দাবি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করতে পারা ভাটাগুলোর বিরুদ্ধে শুধু মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জরিমানা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগকারীরা পরিবেশ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, পরিদর্শক ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নুর হাসান সজিব বলেন, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। ফাইতংয়ের ৮টি ইটভাটার বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা এবং বাকি ২৪টির বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টে জরিমানার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “প্রথমত আমাদের লোকবল কম। তাই ধাপে ধাপে সবকটি ইটভাটাকে মামলার আওতায় আনা হবে।”
বান্দরবান জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, অবৈধ ইটভাটা ও পাহাড় কাটা ঠেকানো শুধু প্রশাসনের একার দায়িত্ব নয়; স্থানীয় জনগণ ও জনপ্রতিনিধিদেরও আন্তরিক হতে হবে। অভিযোগ লিখিতভাবে প্রশাসনের কাছে পাঠানোর আহ্বান জানান তিনি। নিয়মিত মামলা দায়েরের বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, এটি পরিবেশ অধিদপ্তরের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়।
পরিবেশবাদীদের মতে, বিষয়টি শুধু পাহাড় কাটার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে পাহাড়ের ভূমির স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়া, ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন, বন ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং পরিবেশ আইন অমান্য করে ইটভাটা পরিচালনার মতো গুরুতর বিষয় জড়িত।
চলতি ২০২৫-২৬ ইটভাটা মৌসুমে লামায় ইটভাটা চালু রাখার সম্ভাবনা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট মেসেজ রয়েছে, পার্বত্য অঞ্চলে কোনো ইটভাটা আর চালু করতে দেওয়া হবে না।”
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীরা বলছেন, মন্ত্রীর এই বক্তব্য বাস্তবায়নে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে শুধু জরিমানা নয়, সংশ্লিষ্ট সব আইন ও বিধিমালা প্রয়োগ করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.