নরসিংদী প্রতিনিধি
জন্ম থেকেই দুই হাত নেই। পায়ের আঙুলের সাহায্যে লেখাপড়া শিখে অর্জন করেছেন স্নাতক ডিগ্রি। এরপর নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সীমাবদ্ধতাকে জয় করে বর্তমানে প্রায় ১৫০ শিক্ষার্থীর মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন নরসিংদী সদর উপজেলার পাঁচদোনা ইউনিয়নের নগর পাঁচদোনা এলাকার শিক্ষক আলতাফ হোসেন ওরফে দুঃখু মিয়া। তাঁর অদম্য জীবনসংগ্রাম ও শিক্ষার প্রতি নিষ্ঠার কথা গণমাধ্যমে প্রকাশের পর এবার তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে নরসিংদী জেলা প্রশাসন।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুঃখু মিয়ার প্রতিষ্ঠিত ‘প্রতিভা দুঃখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন’ পরিদর্শন করেন নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহান কেয়া। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন নরসিংদী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা জাহান সরকার এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেফতাহুল হাসান।
পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক দুঃখু মিয়াকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্কুলব্যাগ, পানির পট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন ও দাবা খেলার সামগ্রী বিতরণ করা হয়। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে রোপণের জন্য দেওয়া হয় ১৫০টি বনজ, ফলজ ও ঔষধি গাছের চারা।
নগর পাঁচদোনা এলাকায় একটি জীর্ণ টিনশেড ঘরে চলছে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম। সীমিত অবকাঠামো ও আর্থিক সংকটের মধ্যেও পায়ের আঙুলের সাহায্যে পাঠদান করে যাচ্ছেন দুঃখু মিয়া। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তাঁর এই শিক্ষাসেবা স্থানীয়দের কাছে অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
নিজের স্বপ্নের কথা তুলে ধরে দুঃখু মিয়া বলেন, চরম আর্থিক সংকটের কারণে বিদ্যালয়টি বড় করা সম্ভব হচ্ছে না। এলাকার শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রাথমিক বিদ্যালয়টিকে একটি পূর্ণাঙ্গ মডেল উচ্চবিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে চান তিনি। নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমার দুটি হাত নেই, কিন্তু এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রয়েছে শত হাত। এটাই আমার জীবনের বড় সার্থকতা।”
দুঃখু মিয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া বলেন, “আলতাফ হোসেন দুঃখু মিয়া শুধু নরসিংদীর নন, পুরো দেশের গর্ব। তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি, মনোবল ও স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে জেলা প্রশাসন ও সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।”
নিজের প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো জেলা প্রশাসককে সরাসরি পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন দুঃখু মিয়া। তিনি বলেন, “আমার জীবনে এটি সবচেয়ে সেরা পাওয়া। স্কুল প্রতিষ্ঠার পর অনেক জায়গায় গিয়েছি। সবাই আশ্বাস দিলেও কেউ কোনো দিন আমার স্কুলে আসেননি। এবারই প্রথম সরকারি সহযোগিতা পেলাম, তাও জেলা প্রশাসক নিজে এসে দিয়েছেন। তাঁর আসার পর মনে হচ্ছে, মডেল উচ্চবিদ্যালয় গড়ার স্বপ্ন এবার বাস্তবায়িত হবে।”
দুঃখু মিয়ার শিক্ষাজীবনের শুরুটাও ছিল নানা বাধায় ভরা। শৈশবে মাদ্রাসায় ভর্তি হতে গেলে পা দিয়ে বই ধরতে পারবেন না—এমন কারণ দেখিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রতিকূলতার কাছে হার মানেননি তিনি। বাবা-মায়ের সহযোগিতায় কলাপাতায় পাতিলের কালি দিয়ে পায়ের আঙুলে লেখার অনুশীলন শুরু করেন। কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে ১৯৮৬ সালে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে বিএ পাস করেন।
উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে একাধিক সরকারি-বেসরকারি চাকরির সুযোগ হাতছাড়া হয় তাঁর। তবে হতাশ হয়ে বসে থাকেননি। ২০০৭ সালে পৈতৃক জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্রতিভা দুঃখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন’। বর্তমানে প্রায় ১৫০ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা।
দুঃখু মিয়ার স্বপ্ন একটি পূর্ণাঙ্গ মডেল উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগে তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের নতুন আশা তৈরি হয়েছে। এখন বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার অপেক্ষায় রয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.