যশোর প্রতিনিধি
ভবদহ অঞ্চলে জলাবদ্ধতায় ডুবে গেছে ধানের জমি, নষ্ট হয়েছে ফসল। কাজের অভাবে দিশেহারা নিম্ন আয়ের বহু পরিবার। এমন পরিস্থিতিতে বিল থেকে শাপলা তুলে বিক্রি করেই সংসার চালাচ্ছেন যশোরের মণিরামপুরসহ ভবদহ অঞ্চলের শত শত মানুষ। ভোররাতে বিল থেকে শাপলা সংগ্রহ করে হাট-বাজারে বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে তাঁদের সংসার ও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ।
জাতীয় ফুল শাপলা বর্ষা মৌসুমে অনেক পরিবারের কাছে শুধু সবজি নয়, আয়েরও অন্যতম উৎস। ভবদহ অঞ্চলের বিলগুলোতে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো শাপলা সংগ্রহ করে কেউ খুচরা, কেউবা পাইকারি দরে বিক্রি করছেন। যশোর শহরসহ বিভিন্ন হাট-বাজারে এখন দেখা মিলছে শাপলা বিক্রির। কম দামে পাওয়া যায় বলে নিম্ন আয়ের মানুষও কিনছেন এই সবজি।
‘যশোরের দুঃখ’ হিসেবে পরিচিত ভবদহ অঞ্চল যশোরের মণিরামপুর, কেশবপুর, অভয়নগর ও সদর উপজেলা ছাড়াও খুলনার ডুমুরিয়া এবং সাতক্ষীরার তালার কিছু এলাকা নিয়ে বিস্তৃত। বছরের দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতায় ডুবে থাকে এ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা। এতে কৃষিকাজ ব্যাহত হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষক ও দিনমজুরেরা। বিকল্প হিসেবে অনেকে মাছ চাষ, জলজ উদ্ভিদ সংগ্রহ ও বিক্রির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
মণিরামপুর উপজেলার ঢাকুরিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ও বাজারে ভ্যানগাড়িতে শাপলা বিক্রি করেন ভোমরদহ গ্রামের আসলাম শেখ। প্রতিদিন ভোররাতে সুবলকাটি ডুমুর বিল ও সম্বলডাঙ্গা বিল থেকে শাপলা সংগ্রহ করে বিভিন্ন বাজারে নিয়ে যান তিনি।
আসলাম শেখ জানান, প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ মুঠো শাপলা সংগ্রহ করেন তিনি। প্রতি মুঠোয় থাকে ১০টি শাপলা, দাম ১০ টাকা। সব মিলিয়ে প্রতিদিন তাঁর আয় হয় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা।
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, “বর্ষার পানিতে আমাদের ধানের জমি তলিয়ে গিয়ে ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। ভবদহ অঞ্চলের মানুষ বড্ড কষ্টে আছে। জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হলে আমাদের এই দুঃখ-দুর্দশার শেষ হবে না। আমরা এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি চাই।”
একই গ্রামের মতো দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন হাজরাইল গ্রামের পরিমল দাসও। তিনি বলেন, “পানিতে আমাদের মাঠ তলিয়ে গেছে, আমরা কষ্টে আছি। এখন আমাদের পেশাই হয়ে দাঁড়িয়েছে শাপলা তুলে বিক্রি করা। এক আঁটিতে ১০ থেকে ১২টি শাপলা বেঁধে যশোর শহরে নিয়ে বিক্রি করি। ১০ টাকা করে আঁটি বিক্রি করে যা পাই, তা দিয়েই সংসার আর ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালাই। আমাদের এলাকার বহু লোক এখন শাপলা সংগ্রহ ও বিক্রি করে বেঁচে আছে।”
আরেক বিক্রেতা আক্তার হোসেন জানান, বিল থেকে শাপলা তুলে পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় আঁটি বাঁধেন তিনি। পরে বিভিন্ন বাজারে দোকানিদের কাছে প্রতি আঁটি পাঁচ থেকে ছয় টাকা পাইকারি দরে বিক্রি করেন। এতে প্রতিদিন তাঁর আয় হয় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা।
আক্তার হোসেন বলেন, “বিলে পানি জমে থাকার কারণে মাঠে কেউ ধানের আবাদ করতে পারেনি। চরম কষ্টের মধ্য দিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে। মাঠে ধান না হওয়ায় আমার মতো শত শত মানুষ এখন শাপলা বিক্রি করেই জীবন ধারণ করছে।”
অন্যদিকে, শাপলা কিনে সংসারের খাবারের জোগান দিচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষও। ক্রেতা আমেনা খাতুন বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। বাজারে বর্তমানে সবজির অনেক দাম। এত দাম দিয়ে পছন্দের শাপলা কেনা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। এখন এলাকায় শাপলা বিক্রি করতে লোক আসে। তাদের কাছ থেকে শাপলা কিনে রান্না করে খাই। খেতে ভালো, আবার দামও সস্তা। মাত্র ১০ টাকায় এক আঁটি শাপলা পাওয়া যায়।”
ভবদহের মানুষের কাছে শাপলা এখন একদিকে স্বল্পমূল্যের খাবার, অন্যদিকে জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন। তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হলে আবারও আবাদি জমিতে ফিরবে ফসল, কমবে মানুষের দুর্ভোগ। তখন আর জীবিকার তাগিদে বিলের শাপলা বিক্রির ওপর নির্ভর করতে হবে না বহু পরিবারকে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.