যশোর প্রতিনিধি
শীত আসার আগেই খেজুরগাছের ডালপালা পরিষ্কার করছেন গাছিরা। কোথাও গাছের মাথা ছেঁটে রস সংগ্রহের উপযোগী করা হচ্ছে, কোথাও প্রস্তুত করা হচ্ছে পুরোনো গাছ। কয়েক দিনের মধ্যে গাছে গাছে ঝুলবে মাটির হাঁড়ি। ভোরে সেই হাঁড়িতে জমবে মিষ্টি রস। এরপর বাড়ির উঠানে চুলায় জ্বাল দিয়ে তৈরি হবে গুড় ও পাটালি। যশোরের গাছিদের কাছে শীত মানেই বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপার্জনের মৌসুম।
চৌগাছার গাছি রহিম মিয়া গত মৌসুমে ১১৭টি খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় ও পাটালি তৈরি করেছিলেন। মান ভালো হওয়ায় ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডারও পেয়েছিলেন। সব মিলিয়ে বিক্রি করেছিলেন প্রায় ৯০ হাজার টাকার গুড়-পাটালি। এবারও একই প্রত্যাশা নিয়ে গাছ প্রস্তুত করছেন তিনি। তবে তাঁর অভিজ্ঞতায়, শুধু খেজুরগাছ থাকলেই এ পেশা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দক্ষ গাছি, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম এবং খাঁটি গুড়ের বাজার নিশ্চিত করা।
রহিম মিয়ার মতো যশোরের হাজারো গাছির কাছে খেজুরের রস ও গুড় শীতকালীন আয়ের অন্যতম ভরসা। জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এ শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কয়েক মাসের উৎপাদন ও বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন গাছি পরিবার, জ্বালানি সরবরাহকারী, মাটির হাঁড়ি প্রস্তুতকারক, ব্যবসায়ী ও পরিবহনকর্মীরা।
তবে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পের সম্ভাবনার পাশাপাশি বাড়ছে নানা সংকট। নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ, দক্ষ গাছির অভাব, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বাজারে খাঁটি গুড়ের সঙ্গে কম দামের পণ্যের প্রতিযোগিতা এ শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
চৌগাছা উপজেলার হাকিমপুর গ্রামের কয়েকটি পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখলেও নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশ শ্রমসাধ্য এ কাজে আগ্রহী নয়। শীতের ভোরে গাছে ওঠা, নিয়মিত পরিচর্যা, রস সংগ্রহ এবং দীর্ঘ সময় চুলায় জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করা সহজ কাজ নয়। আবার বছরের কয়েক মাসের আয় দিয়ে সারা বছরের সংসার চালানোর চাপও রয়েছে। ফলে অভিজ্ঞ গাছির সংখ্যা কমে গেলে তাঁদের জায়গায় নতুন গাছি তৈরি না হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
জিআই স্বীকৃতিতে নতুন সম্ভাবনা
যশোরের খেজুরের গুড়ের সুনাম দেশজুড়ে। ‘যশোরের যশ, খেজুরের রস’ প্রবাদটি এ অঞ্চলের সঙ্গে পণ্যটির ঐতিহাসিক সম্পর্ক তুলে ধরে। ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ায় যশোরের খেজুরের গুড়ের পরিচিতি ও বাজার সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যশোরে রস আহরণের উপযোগী খেজুরগাছের সংখ্যা ৩ লাখ ১২ হাজার ৯৬১টি। এসব গাছ থেকে চলতি মৌসুমে ৩ কোটি ৮৮ লাখ ৬ হাজার ৫৬৫ লিটার রস সংগ্রহ এবং ৩ হাজার ৯০ মেট্রিক টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
জেলায় উৎপাদিত গুড়ের বড় অংশ স্থানীয় হাটবাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। শীতকালে শহরের বাসাবাড়ি, মিষ্টি তৈরির প্রতিষ্ঠান ও পিঠার দোকানে খেজুরের গুড়ের চাহিদা বাড়ে। পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার মাধ্যমে অনেক উদ্যোক্তা সরাসরি ক্রেতাদের কাছে গুড় ও পাটালি পৌঁছে দিচ্ছেন। এতে প্রচলিত বাজারের বাইরে নতুন ক্রেতা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
উৎপাদন খরচ ও বাজারের প্রতিযোগিতা
খেজুরের গুড় উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী হলেও বাজারের প্রতিযোগিতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে জেলার খেজুরবাগানের মালিক মামুন কাউছারের। তাঁর মতে, খাঁটি গুড় তৈরিতে প্রচুর রস, শ্রম ও জ্বালানি প্রয়োজন হওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেশি পড়ে। অথচ বাজারে তুলনামূলক কম দামে গুড় পাওয়া যায়। এসব পণ্যের উপাদান ও মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
মামুন কাউছার বলেন, এক কেজি গুড় তৈরি করতে প্রায় ১০ লিটার রস প্রয়োজন হয়। উৎপাদনের বিভিন্ন খরচ বিবেচনায় খাঁটি গুড়ের বাণিজ্যিক ব্যয় অনেক বেশি। গত মৌসুমে তিনি প্রতি কেজি গুড় সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা দরে বিক্রি করেছেন। অথচ বাজারে ২৫০ টাকা কেজি দরেও গুড় পাওয়া যায়। তাঁর মতে, দামের এত পার্থক্যের কারণ ক্রেতাদের বুঝতে হবে এবং কেনার আগে গুড়ের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
তিনি আরও বলেন, খেজুরগাছের বাগান সম্প্রসারণে সরকারি উদ্যোগ ও সহায়তা প্রয়োজন। প্রদর্শনী প্লট, আধুনিক উৎপাদনপ্রযুক্তি এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় সহায়তা পাওয়া গেলে এ শিল্প আরও এগিয়ে যেতে পারে। খেজুরের গুড় রপ্তানির ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সুযোগ ও অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
বাজারে ভেজাল গুড়ের অভিযোগ খাঁটি গুড় উৎপাদনকারীদের জন্যও উদ্বেগের বিষয়। কম দামের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে প্রকৃত উৎপাদকরা ন্যায্য দাম না পেলে এ পেশায় আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নিরাপদ উৎপাদনেও গুরুত্ব
খেজুরের রস ও গুড়ের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা ও গুণগত মান নিশ্চিত করাও জরুরি। গাছিদের জন্য আধুনিক ও নিরাপদ গাছে ওঠার সরঞ্জাম, রস সংগ্রহের পরিচ্ছন্ন পদ্ধতি, উন্নত চুলা এবং গুড় তৈরির প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিপাহ ভাইরাসের ঝুঁকি সম্পর্কে গাছি ও ক্রেতাদের সচেতন করা দরকার। বাদুড়ের মাধ্যমে দূষিত কাঁচা খেজুরের রস পান করলে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই কাঁচা রস পান থেকে বিরত থাকা এবং নিরাপদভাবে রস সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, যশোরের খেজুরের গুড়ের ঐতিহ্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও রয়েছে। জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। নিরাপদ খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদনে গাছিদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণ ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমেও তাঁদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। তবে গাছিদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, খাঁটি গুড়ের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, দক্ষ গাছি তৈরি, আধুনিক উৎপাদনপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে যশোরের খেজুরের রস-গুড়ের ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.