শামসুল হক ভূঁইয়া, গাজীপুর
দীর্ঘ ১৪ বছরের ভোগান্তি, যানজট ও ব্যয়বহুল নির্মাণকাজের অবসান ঘটাতে ঢাকা-গাজীপুর বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রকল্পের জন্য নির্মিত বিশেষ লেন, স্টেশন ও বিভাজক অপসারণ করে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কটি ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তর করা হবে। গত ১৮ অক্টোবর মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তির আশায় স্বস্তি ফিরছে গাজীপুরবাসীর মধ্যে।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করে আইনি জটিলতা নিরসনের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিআরটির জন্য গঠিত পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি’ বন্ধ করে এর কার্যক্রম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আওতায় আনার সিদ্ধান্তও হয়েছে।
উত্তরবঙ্গের ২৩টি জেলা ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের সাত জেলাসহ মোট ৩০টি জেলার মানুষের রাজধানীতে যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ গাজীপুর। একসময় চান্দনা চৌরাস্তা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত মহাসড়কে অপরিকল্পিত বাসস্টপেজ, কাঁচাবাজার, অবৈধ যানবাহন ও ফুটওভারব্রিজের অভাবের কারণে নিয়মিত যানজট সৃষ্টি হতো।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে ২০১২ সালের নভেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বিআরটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রাথমিক পরিকল্পনায় চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ঢাকার কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত বিআরটি লেন নির্মাণের কথা থাকলেও পরে প্রকল্পটি সংকুচিত করে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটারে সীমিত করা হয়।
প্রকল্পটি চালুর সময় বলা হয়েছিল, বিআরটি চালু হলে মাত্র ৩০ মিনিটে চান্দনা চৌরাস্তা থেকে বিমানবন্দরে পৌঁছানো যাবে এবং প্রতি ঘণ্টায় ২০ হাজার যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে। ২০১২ সালে প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৩৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ সরকার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (এএফডি) ও গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটির (জিইএফ) অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সেতু বিভাগ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এর বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল।
প্রকল্প শুরুর পর থেকেই নকশা, ভূমি অধিগ্রহণ, সেবা সংস্থার লাইন স্থানান্তর ও সমন্বয়হীনতা নিয়ে নানা জটিলতা দেখা দেয়। সড়কের পানি নিষ্কাশন, ফুটপাত, সড়কবাতি ও নির্মাণকালে বিকল্প যান চলাচলের ব্যবস্থার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। ২০১৮ সালে বড় পরিসরে নির্মাণকাজ শুরু হলেও তা জনদুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেয়।
সড়কের মাঝখানে কংক্রিটের বিভাজক ও লোহার বেড়া বসানোর কারণে চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ে। বিমানবন্দর-গাজীপুর সড়কে প্রতিদিন যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষ, পোশাকশ্রমিক ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দীর্ঘ যানজট ও ধুলাবালির দুর্ভোগ পোহাতে হয়। নির্মাণকাজ চলাকালে একাধিক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে।
প্রকল্পের ব্যয়ও সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। ২০১৬ সালের নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। এ সময় ব্যয় পুনর্নির্ধারণ করা হয় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। পরে ২০২৫ সালে মেয়াদ ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়ে ব্যয় ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হলে ওই বছরের ২৭ জুলাই একনেক তা বাতিল করে দেয়।
নির্মাণকাজের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্রেন দুর্ঘটনা ও লঞ্চিং গার্ডার ধসের মতো ঘটনায় নিরাপত্তারক্ষী জিয়াউর রহমানসহ অন্তত সাতজন শ্রমিক ও পথচারীর মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। অন্যদিকে, বিআরটি পরিচালনার জন্য কোম্পানি গঠন করা হলেও বিশেষ বাস কেনা হয়নি। এ নিয়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও সরকারি অর্থের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
গত ১৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন বিকল্প পর্যালোচনা করা হয়। এর মধ্যে চতুর্থ বিকল্পটি গ্রহণ করা হয়। এতে বিআরটির জন্য নির্মিত বিশেষ অবকাঠামো অপসারণ করে সড়কটিকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের প্রস্তাব রাখা হয়েছিল।
পরদিন ১৯ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো চিঠিতে বিআরটি করিডরের স্টেশন ও লেন বিভাজক সরিয়ে দুই পাশে তিনটি করে মোট ছয় লেনের মহাসড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। পাশাপাশি প্রকল্পের দুটি দুই লেনের ওভারপাস চার লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করে বিদ্যমান আইনি জটিলতা নিরসন করতে হবে। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্প বন্ধ বা ‘প্রজেক্ট ক্লোজার’ সম্পন্ন করা হবে। বিআরটি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে এর কার্যক্রম সওজের আওতায় নেওয়ার পাশাপাশি ১৫ দিনের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে বিআরটি প্রকল্পের কারণে যানজট ও দুর্ভোগে থাকা গাজীপুরবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত অবকাঠামো অপসারণ ও সড়ক সংস্কারের মাধ্যমে স্বাভাবিক যান চলাচল নিশ্চিত করা হবে। তবে প্রকল্প বন্ধের সিদ্ধান্তের সুফল পেতে দ্রুত বাস্তবায়ন, কার্যকর সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.