যশোর প্রতিনিধি
ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যশোরে বাড়ছে জ্বর, সর্দি-কাশি, বমি ও নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন মৌসুমি রোগের প্রকোপ। এতে যশোর জেনারেল হাসপাতালে রোগীর চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি ভিড় শিশু বিভাগে। মাত্র ২৪টি শয্যার বিপরীতে সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ১২৬ জন শিশু। শয্যা না পেয়ে অধিকাংশ শিশুকে হাসপাতালের মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত বিভিন্ন সমস্যায় মোট ৩৪০ জন রোগী প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসা নিয়েছেন। বুধবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত শিশু বহির্বিভাগের ১১৩ ও ১১৪ নম্বর কক্ষে ২২৩ জন শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে পুরুষ বহির্বিভাগে ৬২ জন এবং মহিলা বহির্বিভাগে ৫৫ জন সেবা নিয়েছেন।
এদিকে ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৬১ জন। তাঁদের মধ্যে ১২৬ জন শিশু, ১২ জন পুরুষ ও ২৩ জন নারী রয়েছেন।
হাসপাতালের শিশু বিভাগ ঘুরে দেখা গেছে, ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকায় চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। একই অবস্থা নবজাতক বিভাগেও। সেখানে মাত্র ১০টি শয্যার বিপরীতে ভর্তি রয়েছে ২৬ নবজাতক। পুরুষ ও মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডেও রোগীর অতিরিক্ত চাপ রয়েছে।
যশোর সদর উপজেলার নূরপুর গ্রামের জ্যোৎস্না বেগম জানান, তাঁর দুই বছরের শিশু রেজাউলের ১২ অক্টোবর থেকে প্রচণ্ড জ্বর, বমি ও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিয়েও সুস্থ না হওয়ায় বুধবার শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করেন তিনি।
শিশু ওয়ার্ডে রেজাউলের মতো আরও অনেক শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে তিন মাস বয়সী আবদুল্লাহ, তিন বছরের আয়েশা ও ১৬ মাস বয়সী ফারজানাসহ অনেকে। শয্যার অভাবে এসব শিশুর অনেককেই মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
বড়দের মধ্যেও জ্বর ও অন্যান্য উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির প্রবণতা বেড়েছে। যশোরের মালঞ্চি গ্রামের নজরুল ইসলাম জানান, গত রোববার থেকে তাঁর প্রচণ্ড জ্বর। স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ খেয়েও সুস্থ না হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একইভাবে জ্বর, বমি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন সদর উপজেলার শেখহাটি বাবলাতলা এলাকার সিরাতুন মুনিরা।
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের ইনচার্জ সেবিকা জেসমিন খাতুন বলেন, ওয়ার্ডে শয্যা রয়েছে ২৪টি। অথচ ভর্তি রয়েছে ১২৬ শিশু। ফলে অতিরিক্ত শিশুদের মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। বর্তমানে শিশুদের ওষুধের কোনো সংকট নেই বলেও জানান তিনি।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের নার্সিং তত্ত্বাবধায়ক রহিমা আক্তার বলেন, ২৫০ শয্যার এ হাসপাতালে রোগী থাকছেন ৬০০ জনের বেশি। ভাইরাসজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীদের চাপও বেড়েছে। সীমিত জনবল নিয়ে সেবিকারা তাঁদের সাধ্যমতো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
হাসপাতালের শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুস সামাদ বলেন, ঋতু পরিবর্তনের কারণে শিশুদের মধ্যে ভাইরাসজনিত সংক্রমণ বাড়ছে। আবহাওয়ার পরিবর্তন, ধুলাবালি ও পরাগরেণুর কারণে অ্যালার্জি, ত্বকে র্যাশ এবং হাঁপানির সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। পাশাপাশি ডায়রিয়া, জন্ডিস, খাদ্যে বিষক্রিয়া ও অন্যান্য পেটের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এ সময় ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি সম্পর্কেও সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি অভিভাবকদের শিশুদের বিশেষ যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া কোনো ওষুধ খাওয়ানো যাবে না। পাশাপাশি শিশুদের পর্যাপ্ত তরল খাবার ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে।
যশোর মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আবু হায়দার মনিরুজ্জামান বলেন, ঋতু পরিবর্তনের সময় শিশুদের পাশাপাশি বড়রাও ভাইরাসজনিত সংক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছেন। বয়স্ক ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি বেশি থাকতে পারে। তাই বাইরে গেলে মাস্ক ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. হুসাইন শাফায়াত বলেন, আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তনে রোগীর চাপ বহুগুণ বেড়েছে। সীমিত শয্যা ও জনবল নিয়েও রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি থাকায় অনেককে মেঝেতে রেখেও চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তিনি সাধারণ জ্বর-সর্দি হলে আতঙ্কিত না হয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.