সৌরভ অধিকারী শুভ, শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি
কাগজে-কলমে শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে কোথাও মাটি বা ইটের কাজ হয়নি। আবার কোথাও পুরোনো ইটের ওপর সামান্য বালু ফেলে নতুন প্রকল্পের বিল তোলার অভিযোগ উঠেছে। বগুড়ার শেরপুরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির (টিআর, কাবিটা ও কাবিখা) আওতায় বাস্তবায়িত বিভিন্ন প্রকল্পে এমন অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শেরপুর উপজেলায় ১৭২টি প্রকল্পে নগদ ৩ কোটি ৯ লাখ ৭৮ হাজার ৫০০ টাকা এবং চাল ও গম মিলিয়ে প্রায় ১৭৪ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে বিভিন্ন প্রকল্প এলাকা ঘুরে বরাদ্দের বিপরীতে কাজের যথাযথ বাস্তবায়ন দেখা যায়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
কুসুম্বী ইউনিয়নের শেওলাগাড়ী জামে মসজিদ থেকে নূর ইসলামের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও কোনো উন্নয়নকাজ হয়নি বলে দাবি স্থানীয় জাহিদুল ইসলাম, আব্দুল রশিদ ও আলতাফ হোসেনের। প্রকল্প সভাপতি মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, অনেক দিন আগের বিষয় হওয়ায় তিনি তা স্মরণ করতে পারছেন না।
একই ইউনিয়নের উদয়কুঁড়ি-উছলবাড়ীয়া সড়কে ৫ লাখ টাকার সোলিং প্রকল্পে তিন ধাপে মাত্র ১০ থেকে ১২ হাজার ইট বিছানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, পুরো প্রকল্পে মাত্র ছয়জন শ্রমিক কাজ করেছেন। হাপুনিয়া গোরস্থানপাড়ায় চানমিয়ার বাড়ি থেকে গোরস্থান পর্যন্ত সড়কের সোলিং নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
কুসুম্বীর কাঁশিপাড়ায় বায়তুল মোকাররম মসজিদ থেকে পশ্চিম দিকে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা এবং নন্দীগ্রামমুখী সড়কে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৪৩৬ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বড়জোর এক হাজার ইটের কাজ হয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় আফসার আলী ও হাদিউল ইসলাম। নায়েব আলী ও সিদ্দিকের দাবি, নন্দীগ্রাম সড়কে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকার কাজ হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মিলি আক্তার জানান, রাস্তার বেহাল অবস্থায় শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। কৃষকদের ধান পরিবহনেও অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে প্রকল্প সভাপতি ইউপি সদস্য মো. মোকছেদ আলী বলেন, কাজ সঠিকভাবেই হয়েছিল, কিন্তু স্থানীয় কিছু লোক ইট তুলে নিয়েছে।
বিশালপুর ইউনিয়নের কহিতকুলে রায়হানের বাড়ি থেকে আবুলের বাড়ি পর্যন্ত টিআর প্রকল্পে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও নতুন কোনো ইট ব্যবহার করা হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। জাহাঙ্গীর হোসেন ও খলিলুর রহমান জানান, চার বছর আগে নির্মিত সড়কের মাঝের প্রায় ৬০ ফুট পুরোনো ইট তুলে দেড় বছর আগে বালু বিছানো হয়েছিল। নতুন কাজ না করেই সেই পুরোনো কাজের বিপরীতে বিল তোলা হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
একই ইউনিয়নের নাইশিমুলে সোবাহানের বাড়ি পুকুরপাড়ে কাবিখা প্রকল্পে ৭ দশমিক ৬৬ টন গম বরাদ্দে নির্মিত গাইডওয়াল মূল সড়রের চেয়ে প্রায় ১০ ইঞ্চি নিচু হওয়ায় বৃষ্টির পানিতে পথ ডুবে থাকে বলে জানান স্থানীয় আব্দুস সোবাহান, মোহাম্মদ মিজান, মো. আবিরউদ্দিন ও রোশমি বেগম। পশ্চিম নাইশিমুলে গগেনের বাড়ি অভিমুখে চার টন চালের প্রকল্পে নিম্নমানের ইট ব্যবহার, সড়কের সংযোগমুখ বন্ধ এবং চলাচলের অনুপযোগী করে রাখার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় নয়ন কুমার সরকার, মন্টু চন্দ্র ও দিনেশ চন্দ্র।
ভবানীপুর ইউনিয়নের আটাইলে পাশাপাশি দুটি সড়কে কাবিটা প্রকল্পে ৫ লাখ ১ হাজার ৫২০ টাকা বরাদ্দ থাকলেও বড়জোর ১ লাখ ২০ হাজার টাকার কাজ হয়েছে বলে দাবি স্থানীয় জিন্নাত আলী ও মো. সোহেলের। তাঁদের অভিযোগ, সড়কে কোনো মাটিও ফেলা হয়নি। একই ইউনিয়নের বড়াইদহ পশ্চিমপাড়া ঈদগাহ মাঠ সংস্কারে দেড় লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে মাত্র ২৫ গাড়ি মাটি ফেলা হয়েছে বলে জানান স্থানীয় গোলাম, লিলি, আকাশ ও আরাফাত সানী। তাঁদের দাবি, এতে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রকল্প সভাপতি ইউপি সদস্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘চেয়ারম্যান ও সচিব যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, সেভাবেই করেছি।’ তবে ভবানীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বলেন, সিডিউল অনুযায়ী কাজ তদারকির দায়িত্ব প্রকল্প সভাপতির। নিজের দায় তিনি এড়াতে পারেন না।
খামারকান্দি ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ঘোড়দৌড় নতুনপাড়ায় মজিদের বাড়ি থেকে জামে মসজিদ অভিমুখী সড়কে ব্রিক সোলিং ও মাটি ভরাটের জন্য কাবিখা প্রকল্পে ৮ দশমিক ০২৯১ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৪ লাখ টাকা। প্রকল্প সভাপতি ছিলেন ইউপি সদস্য সাদিক হাসান শামীম। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরো রাস্তাটি কাঁচা মেঠোপথ হিসেবে পড়ে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. বাদশা জানান, রাস্তায় মাটি ভরাট বা ইটের কোনো কাজ হয়নি। এমনকি বরাদ্দ সম্পর্কেও গ্রামবাসী কিছু জানেন না।
একই ইউনিয়নের ঘোড়দৌড় পশ্চিমপাড়ায় হাফিজের বাড়ি থেকে সালামের বাড়ি পর্যন্ত সড়কে কাবিটা প্রকল্পে ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও কোনো মাটি ফেলা হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয় মো. সাহাদৎ হোসেনের। তাঁর দাবি, পুরোনো ইটের সঙ্গে মাত্র দুই ট্রলি নতুন ইট ও বালু ফেলে কাজ শেষ করা হয়েছে। পারভবানীপুর জান্নাতপাড়ায় মজিবরের বাড়ি থেকে উত্তর-পূর্ব দিকের সড়কে ২ লাখ ৪১৫ টাকার কাজেও নতুন ইট বা মাটি ব্যবহার করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় লাল মিয়া। তাঁর দাবি, তিন বছর আগের পুরোনো ইট তুলে নামমাত্র বালু দিয়ে আবার বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মাগুড়ার তাইড় হাজীপাড়ায় পুকুরপাড়ে গাইডওয়াল নির্মাণ ও মাটি ভরাটে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে কোনো মাটি ফেলা হয়নি বলে জানান স্থানীয় মাসুদুর রহমান।
এসব অভিযোগের বিষয়ে খামারকান্দি ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিলন হোসেন বলেন, বৃষ্টির কারণে মাটি ও প্যালাসাইটিংয়ের কাজ বাকি ছিল। দ্রুত তা সমন্বয় করা হবে।
অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গত বৃহস্পতিবার বেলা ৩টার দিকে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আব্দুল জব্বারের কার্যালয়ে যান প্রতিবেদক। তিনি অপেক্ষা করতে বলে কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যান। দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তিনি ফিরে আসেননি। পরে তাঁর সরকারি মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, ‘আমার যোগদানের আগেই অধিকাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে যেসব প্রকল্পে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে প্রমাণ মিললে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.