
মধুখালী প্রতিনিধি
ফরিদপুরের মধুখালীতে স্কুলে যাওয়ার পথে এক কিশোরীকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। লোকলজ্জার ভয়ে ওই কিশোরী হারপিক খেয়ে আত্মহননের চেষ্টা করেন। ঘটনার প্রায় দেড় মাস পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিজ বাড়িতে মারা যান তিনি। মৃত্যুর আগে এক ভিডিওতে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে অভিযুক্তদের নাম প্রকাশ করে যান কিশোরী, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
নিহত মিথিলা আক্তার ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার আড়পাড়া ইউনিয়নের রাজধরপুর গ্রামের আব্দুল হান্নান খানের মেয়ে। তিনি আড়পাড়া কাজী সিরাজুল ইসলাম স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। বয়স ছিল ১৭ বছর। পারিবারিক সিদ্ধান্তে তার আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের কাবিনও হয়েছিল।
গতরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে স্কুলে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হন মিথিলা। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের রাজধরপুর এলাকায় পৌঁছালে মোটরসাইকেলে এসে মাগুরা জেলার নাকোল গ্রামের রাফি শেখ (২১), রায়নগর গ্রামের রাহুল শেখ (২০) ও সায়মন বিশ্বাস (২০) তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যান। সহযোগিতা করেন সোহাগ শেখ (২০)। তাদের মাগুরার শ্রীপুর থানাধীন নাকোল গ্রামের গড়াই নদীর নির্জন মাটিকাটা ঘাট এলাকায় নিয়ে গিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ।
নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মিথিলা মধুমতি নদীতে ঝাঁপ দেন। স্থানীয়রা ৯৯৯ নম্বরে পুলিশকে জানালে উদ্ধার করে নাকোল পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে অভিমানে বাথরুমে গিয়ে বিষাক্ত হারপিক পান করেন তিনি। তাৎক্ষণিকভাবে মাগুরা জেনারেল হাসপাতাল এবং পরদিন ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা চলে। ১১ দিন পর বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। শারীরিক জটিলতায় কঙ্কালসার হয়ে ওঠেন মিথিলা। গত ২৬ অক্টোবর দিবাগত রাত ১টার দিকে নিজ বাড়িতেই মৃত্যু হয় তার।
পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মৃত্যুর আগে মিথিলা যে ভিডিওটি করেছিলেন, তাতে সোহাগ শেখ, রাফি শেখ, রাহুল শেখ ও সায়মন বিশ্বাসের নাম উল্লেখ করে ঘটনার বর্ণনা দেন।
পরিবারের অভিযোগ, থানায় গেলেও মামলা নেওয়া হয়নি। মিথিলার মা জেসমিন খাতুন বলেন, ‘আমরা কম ঘোরাইনি। একটা সন্তান হারালে কে বসে থাকে? কিন্তু পুলিশ-দারোগা অপরাধীদের শাস্তি দেয় না। দুই থানায় কেস নিল না কেন? যার মৃত্যু হয়েছে, কেস না নিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয় কেমনে?’ তিনি আরও জানান, শ্রীপুর থানায় ওসি একটি সাদা কাগজে সই নিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেন এবং বলেন ময়নাতদন্তের পর কেস হবে।
মিথিলার ভগ্নিপতি বিপ্লব শেখ অভিযোগ করেন, মিথিলার অন্যত্র বিয়ে হওয়ায় তার মামাতো ভাই ক্ষিপ্ত হয়ে রাফির সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিকল্পনামাফিক ঘটনাটি ঘটান। বাবা আব্দুল হান্নান খান সরকারের কাছে দাবি জানান, মেয়ের হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা নিয়ে বিচার নিশ্চিত করা হোক।
পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন। শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওলি মিয়া বলেন, রাফি শেখের সঙ্গে মিথিলার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। অন্যত্র বিয়ের জেরে ১৪ সেপ্টেম্বর মাটিকাটা ঘাটে দীর্ঘক্ষণ গল্প করার পর নদীতে ঝাঁপ দেন তিনি। ঘাটে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ঘাট ফাঁকা ও মানুষের যাতায়াত আছে। উদ্ধারের সময় বা দেড় মাসেও ধর্ষণের কথা জানানো হয়নি। মৃত্যুর পর পরিবারের প্রকাশ করা ভিডিও রহস্যজনক।
মধুখালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সুকদেব রায় বলেন, ঘটনা জানার পর শ্রীপুর থানার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরিবারকে সেখানে পাঠানো হয় এবং একটি অপমৃত্যুর মামলা নেওয়া হয়। পরে জানা যায় মেয়েটি ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। ২ নভেম্বর মিথিলার বাবা চারজনকে আসামি করে অভিযোগ দায়ের করেছেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে মেয়ের মৃত্যুতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বাবা হান্নান শেখ। মা জেসমিন খাতুন অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। প্রতিবেশীরা বাড়িতে ভিড় করছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.