কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি
দীর্ঘ ৪০ বছরের অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে কুয়াকাটার গঙ্গামতি এলাকার মানুষের। পর্যটকদের যাতায়াত সহজ করতে গঙ্গামতির খালের ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে ৩০ মিটার দীর্ঘ গার্ডার ব্রিজ। ব্রিজটি চালু হলে গাড়ি নিয়ে সরাসরি গঙ্গামতি সৈকতে যেতে পারবেন পর্যটকরা। পাশাপাশি বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাসকারী দেড় সহস্রাধিক মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ভোগান্তি কমবে। বিশেষ করে জেলে পরিবারগুলোর যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথও সুগম হবে।
৩ কোটি ১৫ লাখ ৫৯ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত ব্রিজটির মূল কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বর্তমানে চলছে সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশা, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ব্রিজটি চালু করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া ব্রিজের দুই পাশে বেড়িবাঁধসংলগ্ন ৫৫ মিটার এলাকায় পর্যটকদের গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য তৈরি করা হচ্ছে পার্কিং জোন।
সরেজমিনে দেখা যায়, ব্রিজের নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া গঙ্গামতির খালে গোসল করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। খালের দক্ষিণ পাড়ে বেড়িবাঁধের বাইরে প্রায় ৪০ বছর ধরে বসবাস করছেন ৫০ বছর বয়সী মোশাররফ বিশ্বাস। তিনি জানান, খালটির সঙ্গে গঙ্গামতির লেকের সংযোগ রয়েছে। বর্তমানে খালে ৩ থেকে ৪ ফুট পানি থাকে। স্থানীয়রা এই পানি গোসল ও রান্নার কাজে ব্যবহার করেন। তবে কেউ কেউ খালে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করছেন।
ঘূর্ণিঝড় সিডরের ভয়াবহ স্মৃতিচারণ করে মোশাররফ বিশ্বাস বলেন, সিডরের সময় পানির প্রবল স্রোতে তাঁর ভাইয়ের ছেলে দুই বছরের শিশু কালাচান বাবা-মায়ের হাত থেকে ছুটে গিয়ে মারা যায়। তখন সবাই সাঁতরে বেড়িবাঁধের ভেতরে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ওই সময় ব্রিজটি থাকলে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটত না।
তিনি আরও বলেন, বেড়িবাঁধের বাইরে প্রায় ৬০০ ভোটার ও ৪০০ জেলে পরিবারের দেড় সহস্রাধিক মানুষ বসবাস করেন। ব্রিজটি চালু হলে তাঁদের দীর্ঘদিনের যাতায়াত সমস্যার সমাধান হবে।
স্থানীয় প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাত বছর বয়সী রবিউল জানায়, বর্ষা মৌসুমে খালে পানি বেড়ে গেলে স্কুলে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় স্কুলে যাওয়া সম্ভব হয় না। ব্রিজটি চালু হলে তাদের চলাচল সহজ হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা মুসা বিশ্বাস, মো. মহসিন ও মো. দেলোয়ার হোসেনও ব্রিজটি চালুর অপেক্ষায় রয়েছেন। তাঁদের মতে, এটি চালু হলে প্রায় চার দশকের দুর্ভোগের অবসান ঘটবে। তবে মিজানুর রহমান অভিযোগ করেন, একটি মহল ব্রিজ নির্মাণের বিরোধিতা করে খাল ও সংযোগ সড়ক নেই বলে অপপ্রচার চালিয়েছে। কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রিজ নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তারা।
ব্রিজটি চালু হলে কুয়াকাটার পর্যটন যোগাযোগব্যবস্থায়ও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। বর্তমানে কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট থেকে পশ্চিম দিকে লেম্বুরবন পর্যন্ত সৈকত ধরে যাতায়াত করা গেলেও গঙ্গামতি সৈকতে যেতে পর্যটকদের বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হয়। নতুন ব্রিজ চালু হলে ৩৩ কানি-সংলগ্ন এলাকা থেকে সরাসরি সৈকতে যাওয়া সম্ভব হবে। এতে পর্যটকদের জন্য তৈরি হবে বিকল্প যোগাযোগপথ।
স্থানীয়দের জন্যও ব্রিজটির গুরুত্ব অনেক। বর্ষা মৌসুমে গঙ্গামতির খালে ৫ থেকে ৮ ফুট পর্যন্ত পানি থাকে। ফলে বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাসকারীদের খাল পার হয়ে বাঁধের ভেতরে আসা-যাওয়া করতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। ব্রিজটি চালু হলে এ সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে।
কলাপাড়া উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের ১৭ আগস্ট ৩ কোটি ১৫ লাখ ৫৯ হাজার টাকা ব্যয়ে ব্রিজটি নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ঠিকাদার মো. মহিউদ্দীন আহমেদ নির্মাণকাজ শুরু করলেও ২০২৪ সালের পর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। সম্প্রতি আবারও সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। এ ছাড়া ব্রিজের ওপারে দক্ষিণ দিকে সাগরপাড়ে যাওয়ার পুরোনো প্রায় ১২০০ মিটার সড়ক উন্নয়নের কাজও শিগগির শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
কলাপাড়া উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, বাস্তবতার নিরিখেই কুয়াকাটার উন্নয়নে ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়েছে। এটি চালু হলে পর্যটকরা সহজে সৈকতের আরেকটি আকর্ষণীয় স্থানে যেতে পারবেন। পাশাপাশি বেড়িবাঁধের বাইরের জনগোষ্ঠীও দ্রুত বাঁধের ভেতরে যাতায়াত করতে পারবেন। বর্ষা মৌসুমে খালটিতে ৫ থেকে ৮ ফুট পানি থাকে। ফলে ব্রিজটি স্থানীয় মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ব্রিজটি চালু হলে কুয়াকাটার পর্যটন সম্ভাবনা বাড়ার পাশাপাশি শত শত জেলে পরিবারের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকট ও দুর্যোগকালীন নিরাপত্তাহীনতা কমবে। তবে ব্রিজটির সুফল দীর্ঘস্থায়ী করতে খাল পুনঃখনন ও অবৈধ দখল রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.