নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর
পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে টানা ষষ্ঠ দিনের আন্দোলনে বুধবার দিনভর উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালিত হয়েছে। সকালে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাছা ও বড়বাড়ী এলাকায় শ্রমিকদের অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং বাসন থানায় হামলার চেষ্টার ঘটনা ঘটে। দুপুরে চান্দনা চৌরাস্তায় আন্দোলনে নিহত শ্রমিক তৌফিক হোসেনের গায়েবানা জানাজা ঘিরে পুলিশ ও বিজিবির বিরুদ্ধে সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের অভিযোগ ওঠে। এতে এনসিপি ও সহযোগী সংগঠনের ২০ জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে দলটি। তবে দিনভর উত্তেজনা ও বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের পর বিকেলের দিকে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে। বর্তমানে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ও মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানার সাইনবোর্ড ও বোর্ডবাজারের বড়বাড়ী এলাকায় কয়েক হাজার শ্রমিক ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিকদের সরিয়ে দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এগিয়ে গেলে বিক্ষোভকারীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করলে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাছা থানা এলাকায় দুই থেকে চার হাজার শ্রমিক সড়কে নেমে আসেন। এ সময় তাঁদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। পরে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হয়। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে জয়দেবপুরের দিকেও শ্রমিকেরা অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁদেরও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সালনা, রাজেন্দ্রপুর, শফিপুর ও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় পরিস্থিতি ভালো রয়েছে। তবে কাশিমপুর এলাকায় কিছুটা উত্তেজনা থাকায় পুলিশ সতর্ক অবস্থানে ছিল।
সকালের সংঘর্ষের পর বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ বাসন থানায় হামলার চেষ্টা চালায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ সময় থানার ভেতরে ইটপাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলার চেষ্টা করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। গাজীপুরমুখী অনেক বাস মাঝপথ থেকে ঘুরিয়ে দেওয়ায় কর্মস্থল ও গন্তব্যে যেতে না পেরে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।
এদিকে দুপুর পৌনে ১টার দিকে চান্দনা চৌরাস্তায় শ্রমিক আন্দোলনে নিহত তৌফিক হোসেনের রুহের মাগফিরাত কামনায় গায়েবানা জানাজার আয়োজন করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও জাতীয় শ্রমিক শক্তি। জানাজা শুরুর প্রস্তুতিকালে পুলিশ ও বিজিবি সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে উপস্থিত লোকজনকে ছত্রভঙ্গ করে দেয় বলে অভিযোগ করেন আয়োজকেরা। এতে জানাজা অনুষ্ঠিত হতে পারেনি।
এনসিপির কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক ও নির্বাহী কমিটির সদস্য আলী নাছের খান অভিযোগ করেন, তাঁদের শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় কর্মসূচিতে অন্যায়ভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে। গায়েবানা জানাজা আদায় করতে না দিয়ে কর্মসূচিতে হামলা চালানো হয়েছে। তিনি তৌফিকের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত, বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
আলী নাছের খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, ঘটনায় এনসিপি ও সহযোগী সংগঠনের ২০ জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে জাতীয় শ্রমিক শক্তির আহ্বায়ক মাজহার ফকির, গাজীপুর জেলা এনসিপির সদস্যসচিব আবুল কাশেম মাস্টার, শ্রমিক শক্তির যুগ্ম সদস্যসচিব শেখ রায়হান, গাজীপুর মহানগর যুবশক্তির মুখ্য সংগঠক মো. জিল্লুর রহমান, শ্রমিক শক্তির কেন্দ্রীয় সদস্য শেখ সাহানা, যুবশক্তির কোনাবাড়ী থানার মুখ্য সংগঠক রকিবুল ইসলাম জয়, কালিয়াকৈর উপজেলা এনসিপির সদস্য আকরাম হোসেন ও কোনাবাড়ী থানা যুবশক্তির সদস্যসচিব জামান ঢালিসহ অনেকে রয়েছেন। তবে আহতদের সংখ্যা ও পরিচয় স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
শ্রমিক অসন্তোষ মোকাবিলায় গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করেছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি, আনসার ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নসহ (এসআরবি) মোট ২৫ প্লাটুন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে বিজিবির ১২ প্লাটুন, আনসারের পাঁচ প্লাটুন এবং এসআরবির আট প্লাটুন সদস্য রয়েছেন। আগে বিজিবির ১১ প্লাটুন মোতায়েন থাকলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় তা বাড়িয়ে ১২ প্লাটুন করা হয়েছে।
অন্যদিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সভাপতি মো. শওকত হোসেন সরকার সকালে নেতাকর্মীদের নিয়ে কাশিমপুর, কোনাবাড়ী, ভোগড়া বাইপাস ও চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় অবস্থান নেন। এ সময় তিনি সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে যৌক্তিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। তাই ধৈর্য ধরে আলোচনার মাধ্যমে দাবি আদায়ের চেষ্টা করা উচিত। শিল্পকারখানা সচল রাখা শ্রমিক, মালিক, গাজীপুর ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পক্ষের উসকানিতে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরি না করার আহ্বানও জানান তিনি।
অপরদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য আসাউদ্দিন সরকার নেতাকর্মীদের নিয়ে টঙ্গীর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেন। এ সময় তিনি আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন। তবে গত কয়েক দিনের শ্রমিক আন্দোলনের প্রভাব টঙ্গী শিল্পাঞ্চলে পড়েনি। সেখানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
উল্লেখ্য, শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে ভিডিও ধারণকে কেন্দ্র করে মারধরের শিকার পোশাকশ্রমিক তৌফিক হোসেনের চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। তিনি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের তবি খাঁর ছেলে। গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে লায়লা স্টাইলস লিমিটেড কারখানায় কাজ করতেন তিনি।
তৌফিকের বড় ভাই হারুন মিয়ার অভিযোগ, কারখানা ভাঙচুর করতে আসা আন্দোলনকারীদের পরিচয় দেওয়া দুই ব্যক্তি তৌফিককে এলোপাতাড়ি মারধর করেন। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়ে ঘটনাস্থলেই রক্তবমি শুরু করেন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন প্রথম সাংবাদিকদের কাছে তৌফিকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পুলিশের অভিযানে তিনি আহত হননি; ভিডিও ধারণের সময় শ্রমিকদের মারধরে আহত হয়েছিলেন।
দিনভর উত্তেজনা ও বিক্ষিপ্ত আন্দোলনের পর বর্তমানে গাজীপুরের বিভিন্ন মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতিও অনেকটা শান্ত। তবে নতুন করে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.