রাসেল আহমেদ, খুলনা প্রতিনিধি
খুলনা নগরে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে উদ্বেগ বাড়ছে। চাঁদার দাবিতে একের পর এক বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ওষুধের দোকানে হামলা, ভাঙচুর এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ উঠেছে। কোথাও গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে, কোথাও অস্ত্রের মুখে চিকিৎসক ও প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপকদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। নিরাপত্তাহীনতায় কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে, আবার কেউ ভয়ে থানায় অভিযোগও করছেন না। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা না নিলে জনপ্রতিনিধি হিসেবে মাঠে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল।
রোববার (৮ নভেম্বর) খুলনা প্রেসক্লাবে একটি অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে কর্মকর্তারা আছেন, হয় তাঁরা এ সমস্যার সমাধান করবেন, না হয় তাঁরা আত্মসমর্পণ করে চলে যাবেন। এর কোনো বিকল্প নেই।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ অক্টোবর রাতে নগরের বাবুখান রোডে সন্ধানী ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই রাতে হামলাকারীরা দুই চিকিৎসকের কক্ষ, কাউন্টার ও একটি টেলিভিশন ভাঙচুর করে। আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য গুলিও ছোড়া হয় বলে জানা গেছে।
পরদিন দুপুরে একই মালিকের আরেকটি প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র মহড়া দেয় দুর্বৃত্তরা। এ সময় সেখানে উপস্থিত এক চিকিৎসকের ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তবে এসব ঘটনায় প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ থানায় কোনো অভিযোগ করেনি। মালিকপক্ষের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
এরপর গত ৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় নগরের শামসুর রহমান রোডের আব্দুল্লাহ প্যাথলজি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। প্রথমে ক্যানসারের নমুনা সংগ্রহ নিয়ে বিরোধের কথা জানা গেলেও পরে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ সামনে আসে। এ ঘটনায়ও থানায় মামলা হয়নি।
সর্বশেষ গত শনিবার (৭ নভেম্বর) দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে নগরের খানজাহান আলী রোডের নিউ অ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপককে সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া একটি সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্য হুমকি দিয়েছেন বলে কর্তৃপক্ষের অভিযোগ।
এদিকে চাঁদা দাবির হুমকিতে নগরের টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোডের চয়নিকা ফার্মেসি ১২ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। মুঠোফোনে হুমকি পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন বলে জানা গেছে। নিরাপত্তাহীনতায় দোকান খুলতে পারছেন না মালিক। এ ঘটনায়ও থানায় মামলা হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নগরের আরও কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কর্তৃপক্ষ প্রাণ ও মানসম্মানের ভয়ে নীরবে চাঁদা দিচ্ছেন। ফলে চাঁদাবাজির অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসছে না।
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. লোকমান হোসেন বলেন, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে হামলার ঘটনায় কেউ থানায় অভিযোগ করেননি। তবে সন্ধানীর ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। ওই মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিউ অ্যাপোলোতে হামলার ঘটনায়ও কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেনি। তবে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে নগরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছেন বলে জানান তিনি।
খুলনার নাগরিক সমাজের নেতা আইনজীবী বাবুল হাওলাদার বলেন, বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চাঁদাবাজি, হামলা ও ভাঙচুর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; গত কয়েক মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিরই বহিঃপ্রকাশ। অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়া এবং দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসার কারণে অপরাধী চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। প্রশাসন ও সরকারের উদাসীনতায় চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
খুলনা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার রেজাউর রহমান বলেন, ভুক্তভোগীরা মামলা করছেন না, এমনকি পুলিশকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও করছেন না। দ্রুত জামিনে মুক্তি পাওয়ার বিষয়টিও রয়েছে। এসব কারণে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেছেন। তাঁরা সরকারি দল বা বিরোধী দল বিবেচনা না করে জনগণের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে চান।
তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারি দল এবং বিরোধী দল বুঝি না। আমরা জনগণ, জনগণের প্রতিনিধি। জনগণের পক্ষে আছি। কোনোভাবেই সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য থাকতে দেওয়া হবে না। প্রশাসন কঠিন ব্যবস্থা না নিলে জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমরা মাঠে নামব।’
সন্ত্রাস দমনে আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত সভায় আলোচনা এবং আইনমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন হুইপ।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.