যশোর প্রতিনিধি
এমনিতেই যশোরের চার সড়ক-মহাসড়কের অনেক স্থানের অবস্থা নাজুক দীর্ঘদিন ধরে। তারপরও গত পাঁচদিনের বৃষ্টিতে যশোর জেলার বিভিন্ন মহাসড়ক ও সড়কের বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে। পাকা সড়কে তৈরি হয়েছে বড়বড় খানা-গর্ত। বিভিন্ন রাস্তায় লম্বা জায়গা জুড়ে কাদা জমে আছে, জমে আছে হাটু পানি। রাস্তার বেহালদশার কারণে একদিকে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ঝুঁকির মধ্যে চলছে পরিবহন। আর দুর্ভোগে পড়ছেন যাত্রী সাধারণ। আবার কোথাও ভেঙে পড়ে আছে গাড়ি। যে কারণে প্রতিকুল প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবন যাত্রায়। ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা বাণিজ্যও।
যদিও সড়ক ও জনপথ বিভাগ বলছে, সড়ক-মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে ঢালাই রাস্তা নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, কাজ শেষ হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান মিলবে। সংস্কার কাজও চলমান, শেষ হতে বেশ সময় লাগবে।
গত কয়েকদিন সরেজমিনে দেখা গেছে, চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে যশোর-খুলনা মহাসড়কের বসুন্দিয়া থেকে চেঙ্গুটিয়া পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার অংশ। শত শত গর্ত আর কাদা মিলে বৃষ্টির পর এই সড়ক যেন মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হয়েছে। এতে করে শুধু যাত্রী নয়, স্থবির হয়ে পড়েছে নওয়াপাড়া নৌবন্দর কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যও। বিশেষ করে ভরা মৌসুমে সার সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় কৃষকরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এ মহাসড়কটি দেশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম সড়ক। এটি দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল, যশোরের নওয়াপাড়া নদীবন্দর, মোংলা বন্দর এবং ভোমরা স্থলবন্দরের সাথে যোগাযোগের প্রধান রুট হিসেবে কাজ করে। প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা হাজার হাজার পণ্যবাহী ছোট-বড় যানবাহন এই সড়ক দিয়ে চলাচল করে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা জানান, চলাচলে এই দুর্ভোগের কারণে নওয়াপাড়া নৌবন্দর কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে এসেছে। বিশেষ করে ভরা মৌসুমে সার সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় কৃষকেরাও বিপাকে পড়ছেন।
অভয়নগরের প্রেমবাগ এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সবুর জানিয়েছেন, এ মহাসড়কের পাশেই তাদের গ্রাম। এ সড়ক ব্যবহার করে আমরা যাতায়াত করি। এখানে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা যানবাহন চলাচল করে। গত ৩-৪ বছর ধরে সড়কটি উন্নয়নের কাজ চলমান রয়েছে। তবে একদিকে সংস্কারের কাজ শেষ হতে না হতেই অন্যদিকে সড়ক আবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
ট্রাকচালক রাজিব হোসেন জানিয়েছেন, রুপদিয়া থেকে নওয়াপাড়া পর্যন্ত সড়কটি খানা-খন্দে ভরা। বিশেষ করে চেঙ্গুটিয়া থেকে বসুন্দিয়া পর্যন্ত অংশটি একেবারেই চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। রাস্তায় হাঁটু কাদা সৃষ্টি হওয়ায় গাড়ি নিয়ে চলাচল করা কঠিন হচ্ছে। অনেক গাড়ির এক্সেল ভেঙে আটকে যাচ্ছে। গাড়ি উল্টে রাস্তার পাশে পড়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন বাস ও ট্রাক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই সড়কে ট্রিপ নিলে জ্যামে দুই-তিন দিন আটকে থাকতে হয়।
নওয়াপাড়া শিল্পনগরীর আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান নওয়াপাড়া গ্রুপের ম্যানেজার রাজু আহমেদ জানিয়েছেন, নওয়াপাড়া শুধু একটি নৌবন্দর নয়, এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পনগরীও। এখানকার বন্দরের মাধ্যমে দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানিকৃত সার খালাস করে বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। ভরা মৌসুমে যশোর-খুলনা মহাসড়কের বেহাল অবস্থার কারণে সরবরাহ কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে, স্থলবন্দর বেনাপোলে রাস্তা ঘাটের অবস্থাও বেগতিক। শুধু রাস্তা নয়, ড্রেনেজ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। এ কারণে নানামুখি ঝুঁকিতে পড়েছেন বেনাপোল কাস্টমস, বন্দর, রেলওয়ে ও পৌরসভার কার্যক্রম। আর এ কারণে তাৎক্ষনিক একটি পর্যবেক্ষণ কমিটি করা হয়েছে রাস্তায় জলাবদ্ধতা কাটিয়ে সংস্কার তরান্বিত করতে।
বেনাপোল স্থলবন্দর হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়ন ৯২৫-এর সাধারণ সম্পাদক সহিদ আলী জানিয়েছেন, তারা বেনাপোল বন্দরের পানি নিষ্কাশনের জন্য এবং রাস্তা সংস্কারের মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমাধান চান।
যদিও স্থলবন্দর পরিচালক (ট্রাফিক) মামুন কবীর তরফদার জানিয়েছেন, এসব সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান করতে হলে কমপক্ষে দু’বছর সময় লাগবে এবং বর্তমানে রেলওয়ে তাদের নিজস্ব তদরকিতে পানি নিষ্কাশন করবে, সাথে কাস্টমস তারাও তাদের মত পানি নিষ্কাশন করবে।
এদিকে টানা বর্ষণে যশোর শহরের বিভিন্ন এলাকার রাস্তা নষ্ট হয়েছে। পাড়া-মহল্লার রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থায় পরিণত হয়েছে। পৌরসভা এলাকার অনেক রাস্তা খানা-গর্তে ভরা। রাস্তায় চলাচলকারী যানবাহনগুলো মানুষের দুর্ভোগের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে তথ্য মিলেছে, খড়কি এলাকার শাহ আবদুল করিম সড়কে এম এম কলেজের দক্ষিণ গেট সংলগ্ন খড়কি মোড়ে হাঁটুপানি। আবার পানি জমার কারণে সড়কের বিটুমিনের আস্তরণ উঠে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। পৌর এলাকার একটি মূল রাস্তার মধ্যে খড়কি শাহ আব্দুল করিম রোডের অববস্থা বড়ই করুন।
নীলগঞ্জের বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, সাবেক পৌর মেয়র বকচর মোড় থেকে নীলগঞ্জ সড়কটি একবার সংস্কার করেছিলেন। এরপর আর কেউ এই সড়কটির দিকে তাকাননি। ফলে কেউ এই সড়কটি সংস্কার করতে এগিয়ে আসেননি। এছাড়া শহরের কারবালা, স্টেডিয়াম পাড়া, রায়পাড়া, শংকরপুর, বেজপাড়া, তালতলা, নলডাঙ্গা রোড এলাকা, টিবি ক্লিনিক পাড়া, আশ্রম রোড এলাকা, বরফ কলের মোড়, লোন অফিস পাড়া, বড় বাজার এলাকার আবাসিক এলাকা, ষষ্ঠীতলাসহ অনেক স্পটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
এদিকে, হযরত গরীব শাহ রোডের একটি পুরোনো কালভার্ট ভেঙে রাস্তা ধসে পড়েছে। ১৯৬৮ সালে নির্মিত এই কালভার্টটির নিচে বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দেয়ায় মাজারের সামনের রাস্তার একাংশ ঢালু হয়ে গেছে এবং সৃষ্টি হয়েছে বড় ধরনের ধসের শঙ্কা। ঝুঁকি এড়াতে পৌরসভা রাস্তা বন্ধ করে দিলে শহরের একাধিক এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। গতকাল সারাদিন যান ও জন চলাচল ব্যাহত হয়েছে। দ্রুত এই রাস্তা ও কালভার্ট সংস্কার করার দাবি স্থানীয়দের।
কয়েকটি সড়ক ও মহাসড়কের বেহাল দশার ব্যাপারে সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া জানিয়েছেন, যশোর-খুলনা মহাসড়কের কয়েকটি অংশে মাটির গুণাগুণ খারাপ। আবার ওভারলোড যানবাহন চলাচলের কারণে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। বুয়েটের পরামর্শে ঢালাই রাস্তা নির্মাণের কাজ চলছে। ৪ কিলোমিটার শেষ হয়েছে, আর ২.৩ কিলোমিটারের কাজ চলছে। আরও ৮ কিলোমিটার ঢালাই রাস্তা করা হবে। সব কাজ শেষ হতে আরো দেড় বছর লাগতে পারে।
এদিকে, যশোর শহরের গরীব শাহ কালভার্ট ভেঙে যাওয়ার ব্যাপারে যশোর পৌরসভার প্রশাসক রফিকুল হাসান জানিয়েছেন, পুরোনো এই কালভার্টটি মাঝখান থেকে ভেঙে গেছে, যা বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছিল না। টানা বৃষ্টির কারণে আশপাশের মাটি সরে গিয়ে বিষয়টি এখন স্পষ্ট হয়েছে। যেহেতু এটি সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগের আওতাধীন, তাই তাদের দ্রুত ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছে।
সড়ক ও জনপদ (সওজ) যশোরের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মাহাবুব হায়দার খান জানিয়েছেন, কালভার্টটি ভেঙে যাওয়ার পাশাপাশি সেখানে পৌরসভার একটি পাইপও ফেটে গেছে, ফলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছে। ওই কালভার্ট দিয়েই শহরের একাংশের পানি নিষ্কাশন হয়, তাই সেটি পুরোপুরি বন্ধ করাও সম্ভব নয়। আপাতত কালভার্টের এক পাশে পাইপ স্থাপন করে তার ওপর মাটি ফেলে রাস্তা সচল করার কাজ চলছে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.