হুমায়ন কবির মিরাজ, বেনাপোল
টানা বর্ষণ আর ওপার ভারত থেকে আসা ইছামতী নদীর উজানের প্রবল পানির চাপে আবারও ভয়াবহভাবে প্লাবিত হয়েছে যশোরের শার্শা উপজেলার ঠেঙামারী ও আওয়ালী বিল। পানির নিচে তলিয়ে গেছে প্রায় ৫০০ একর আবাদি জমি। নষ্ট হয়ে গেছে কৃষকের সারা বছরের ভরসা—আউশ ধান, পাট এবং আমনের বীজতলা। মাঠের পর মাঠ এখন শুধুই থৈ থৈ পানি, আর চারদিকে ভেসে বেড়াচ্ছে হতাশাগ্রস্ত কৃষকের দীর্ঘশ্বাস।
বিলসংলগ্ন গোগা, শান্তিপুর, বাইকোলা, গাজীর কায়বা, পাঁড়ের কায়বা, পাঁচকায়বা, ভবানীপুর, রুদ্রপুর, মহিষা, চালিতাবাড়িয়া, দীঘা ও রাড়িপুকুর—এই ১২টি গ্রামের চাষিরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বহু কৃষকের জমিতে এখন ৫ থেকে ৬ ফুট পানি জমে আছে। পাটগাছ পঁচে গেছে, ধানের চারাগুলো পানির নিচে দমবন্ধ হয়ে মারা যাচ্ছে। ফসল হারিয়ে কৃষকেরা অসহায় হয়ে চেয়ে চেয়ে দেখছেন, কিন্তু কিছু করার নেই।
ক্ষতিগ্রস্তদের একজন কায়বা ইউনিয়নের চাষি শহিদুল ইসলাম। চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, “আমার দুই একরের বেশি জমিতে ধান বীজতলা ও পাট ছিল। সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। কিছুই করতে পারলাম না। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে চাষ করেছিলাম—এখন বুঝতে পারছি না কিস্তির টাকা দেব কী দিয়ে। সব স্বপ্ন ধ্বংস হয়ে গেল।”
শুধু শহিদুল নন, একই এলাকার আরও অন্তত চার-পাঁচজন কৃষকের জমিও সম্পূর্ণ ডুবে গেছে। কেউ এক বিঘা, কেউ দেড়—সব মিলিয়ে অন্তত পাঁচ একরের মতো চাষযোগ্য জমি একেবারে পানির নিচে। ক্ষতির আর্থিক অঙ্ক লাখ টাকাকে ছাড়িয়ে গেছে। অথচ এই ক্ষতি পুনরুদ্ধারের কোনো পথ খোলা নেই।
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, প্রতি বছর বর্ষা এলেই এই দুর্দশার পুনরাবৃত্তি ঘটে। ঠেঙামারী ও আওয়ালী বিল ঘিরে থাকা খালগুলো অনেক আগেই ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও আবার খাল দখল করে স্থাপনা তৈরি হয়েছে, কোথাও বাঁধ দিয়ে পানির পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত খনন বা রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় বর্ষার পানি জমে থেকে বিলের জমিগুলো এক ধরনের জলাবদ্ধ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। তার উপর এবার ভারতের উজান থেকে পানি ঢুকে পড়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
রুদ্রপুর গ্রামের কৃষক জাকির হোসেন জানান, তার এক বিঘা জমির পাট সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। বাজারদরে এর ক্ষতি প্রায় ৩০ হাজার টাকা। এমন ক্ষতির শিকার হয়েছেন আশপাশের শতাধিক কৃষক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইছামতী নদীর সংলগ্ন একটি খালমুখের বাঁধ বোরো মৌসুমে সেচের সুবিধার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে কেটে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্ষা আসার আগেও সেই বাঁধটি আর পুনরায় নির্মাণ করা হয়নি। ফলে বর্ষার পানি ও উজানের ঢল সরাসরি ঠেঙামারী ও আওয়ালী বিলে প্রবেশ করে বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্যে বলেন এ বছরে আগাম বৃষ্টিতে আমন ধানের ক্ষতি না হলেও ৫ হেক্টরের মতো বীজ তলার অনেক ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া ৩৫ হেক্টরের মতো আউস ও ২০ হেক্টরের পাট ফসলের ক্ষতি হয়েছে।এ ছাড়া জলাবদ্ধতার কারনে এই বিলে ৫ শ হেক্টরের মতো জমিতে আমন ধান না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি জানান।
উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা কাজী নাজিব হাসান জানান, জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য একটা কমিটি করে দেওয়া হয়েছে।এ ছাড়া ঐ কমিটির কাছে গত বছর ৪ লক্ষ টাকা দিয়েছি পানি নিরাসনের জন্য। এ বছর ২ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
বিলাঞ্চলের এই করুণ চিত্র দেখে প্রশ্ন উঠে—বাংলাদেশ কি শুধু শহরের উঁচু ভবন আর মেগা প্রকল্পেই ব্যস্ত? যারা মাটি ধরে এই দেশটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে, সেই কৃষকদের জন্য কি কারো মন কাঁদে না?
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.