শেখ আরিফুজ্জামান,কালিগঞ্জ প্রতিনিধি
একসময় যেসব খেলা, আচার-আচরণ, পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক সম্পর্ক গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, সময়ের আবর্তে সেগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। কালিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রামীণ সংস্কৃতির সেই সোনালি দিনগুলো হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমেই। নতুন প্রজন্মের কাছে আজ সেই ঐতিহ্য, সেই গন্ধভরা শৈশব একেবারেই অচেনা।
একসময় দিনের শুরু হতো আজানের ধ্বনির পর মাদ্রাসায় গিয়ে ছানা ও দোয়া-কুনুত পাঠ দিয়ে, তারপর পান্তা ভাত খেয়ে স্কুলের পথে যাত্রা। খেলাধুলা ছিল ছেলেমেয়েদের জীবনের আনন্দময় অংশ—গাদন, লুকোচুরি, বুড়িচ্চু, কাবাডি, গোল্লাছুট, পাইট, তারাতুড়ি—সব মিলিয়ে ছিল এক প্রাণবন্ত গ্রামীণ জীবনধারা। পড়ন্ত বিকেলে মেয়েরা একে অপরের চুল বেঁধে দিত, আর সন্ধ্যা ঘনালেই ফিরত মায়ের আহ্বানে, হারিকেনের আলোয় চলত লেখাপড়া।
আজ সেই জীবন কোথায়? ফুটবল আর ক্রিকেটের আধিপত্যে বিলুপ্ত প্রায় গ্রামীণ খেলা, মোবাইল গেম আর ইন্টারনেটের দাপটে হারিয়ে গেছে শিশুদের শারীরিক ও সামাজিক বিকাশের ঐসব প্রাকৃতিক মাধ্যম। রাতভর গল্প, ছড়া, রাম-সাম-যদু-মধু খেলা কিংবা বৃষ্টির দিনে দল বেঁধে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়া—এসব এখন গল্পের অংশ মাত্র।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্যমতে, গ্রামীণ সংস্কৃতির অমূল্য ভাণ্ডারটি এখনও অনেকাংশেই অলিখিত রয়ে গেছে। সাতক্ষীরা ও কালিগঞ্জ অঞ্চলে বহু ছড়া, কবিতা, শ্লোক, গানের সুর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে নেই কোনো সরকারি উদ্যোগ বা স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতা। তাদের মতে, এই ঐতিহ্য রক্ষা না করলে প্রজন্মান্তরে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে যাবে।
কালিগঞ্জের লেখক ও গবেষক অধ্যাপক গাজী আজিজুর রহমান বলেন, “আমি ভয় করি, হয়তো আমার পরে কেউ নিঃস্বার্থভাবে সংস্কৃতি নিয়ে আর কাজ করবে না। এ দায় বর্তমান প্রজন্মের।”
কবি আলীর সৌরভ বলেন, “সংস্কৃতি নিয়ে আমরা কাজ করছি, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।”
অপরদিকে, কবি ও সহযোগী অধ্যাপক রামপ্রসাদ ঘোষ বলেন, “সংস্কৃতির অন্যতম বন্ধন পারিবারিক বন্ধন, যা আজ প্রায় বিলুপ্ত। আগে মায়েরা শেখাতেন সবাইকে দিয়ে খেতে, এখন শেখান গোপনে খেতে। আগে বল দেখলে দৌড়ে খেলতে যেতাম, এখন পায়ে বল গড়ালেও ছুঁয়ে দেখার আগ্রহ নেই।”
স্থানীয় সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন 'কালিগঞ্জ কবিতীর্থ দোলনচাঁপা সাহিত্য পরিষদ' কিছুটা চেষ্টা করলেও নেই নিয়মিত কর্মসূচি বা সরকারি সহায়তা। সরকারিভাবে কোনো সাংস্কৃতিক পরিষদ বা ফান্ড গঠন না হওয়ায় সংস্কৃতির সেতুবন্ধন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
যুগ বদলায়, প্রযুক্তি আসে, জীবনধারায় পরিবর্তন আসে—তবুও শিকড়কে অস্বীকার করা চলে না। কালিগঞ্জসহ দেশের গ্রামীণ এলাকায় সংস্কৃতির হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন সমাজের সচেতন মানুষ, গবেষক, শিক্ষার্থী ও সরকারের সম্মিলিত প্রয়াস।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.