রাসেল আহমেদ, খুলনা প্রতিনিধি
সরকার নির্ধারিত মূল্যে ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে আগ্রহ হারাচ্ছেন খুলনার অধিকাংশ কৃষক। সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান দিতে গিয়ে নানামুখী জটিলতা ও লাভের ঘাটতিতে তাঁরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। বাধ্য হয়ে খাদ্য বিভাগকে নির্ভর করতে হচ্ছে মিল মালিকদের ওপর।
পাইকগাছা উপজেলার মাহমুদকাটি গ্রামের কৃষক সাধন কুমার দাস (৫২) বলেন, ‘সরকারিভাবে ধান বিক্রি করতে অনেক নিয়ম–কানুন। এই শুকনা কম, এই বেশি। আবার চিটা আছে; তাই লস হলেও বাজারে ধান বিক্রি করি। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, রেজিস্ট্রেশন এসব আমরা বুঝি না। ধান কেটে, মাড়াই করে বাজারে দিলেও কোনো ঝামেলা নাই।
তাঁর মতো আরও অনেক কৃষক বলছেন, সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান দিতে গেলে নির্ধারিত আর্দ্রতা ও চিটার মান বজায় রাখা, রেজিস্ট্রেশন, ব্যাংক হিসাব খুলে টাকা গ্রহণসহ নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যা তাঁদের পক্ষে কষ্টসাধ্য। উপরন্তু সরকারি মূল্যে ধান বিক্রি করেও কাঙ্ক্ষিত লাভ হয় না।
লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হলেও কৃষক আসছেন না কেন্দ্রে
খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বোরো মৌসুমে খুলনায় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ৮৭১ মেট্রিক টন। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে এই কার্যক্রম। ইতোমধ্যে সংগ্রহ হয়েছে ৫ হাজার ৮০ মেট্রিক টন, যা লক্ষ্যমাত্রার ১১৯ শতাংশ।
তবে এই সাফল্যের বেশির ভাগ অংশ এসেছে চাতাল মালিকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের মাধ্যমে। অনেক কৃষক সরকারি কেন্দ্রে না গিয়ে মিল মালিকদের কাছে ধান বিক্রি করছেন, কারণ সেখানে ধান শুকানো বা পরিষ্কারের ঝামেলা নেই। যদিও দাম কিছুটা কম, তবে প্রক্রিয়াটি সহজ ও দ্রুত।
তেরখাদার কৃষক নিজাম খা বলেন, ‘সরকারি দামে ধান বিক্রি করতে গেলে রেজিস্ট্রেশন লাগে, শুকনা ধান লাগে, আবার সময়ও বেশি লাগে। কিন্তু চাতালে ধান দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে টাকা পাওয়া যায়। দাম কম হলেও সুবিধা বেশি।
খরচের তুলনায় দাম কম, লোকসানে কৃষক
কৃষকেরা বলছেন, বোরো মৌসুমে বিঘাপ্রতি সেচ, সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রম বাবদ খরচ হয় প্রায় ২০ হাজার টাকা। সে তুলনায় ৩৬ টাকা কেজি দরে সরকারি দামে ধান বিক্রি করে লাভবান হওয়া সম্ভব নয়।
এছাড়া ধান প্রস্তুত করে সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে নিতে পরিবহন ও অতিরিক্ত শ্রম খরচ যোগ হয়, ফলে কৃষকের লোকসান আরও বেড়ে যায়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাড়তি ক্ষতির শিকার
জুলাই মাসে টানা বৃষ্টিতে খুলনায় ৫৭৫ হেক্টর আমন বীজতলার মধ্যে ১০৬ হেক্টর সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নজরুল ইসলাম জানান, জেলায় মোট ২০ হাজার ৮৭০ হেক্টর জমির মধ্যে ৮৪৮ হেক্টর সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১৩ হাজার ৭১ জন কৃষক। মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
তিনি বলেন,এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে হলে খাদ্য বিভাগ,কৃষি বিভাগ ও বিপণন বিভাগকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কৃষককে সহায়তা না করলে তারা ধান চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন।
খাদ্য বিভাগের সন্তুষ্টি, তবে বাস্তবতা ভিন্ন
খুলনা জেলা খাদ্য কর্মকর্তা কাজী সাইফুদ্দিন বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ের আগেই আমরা লক্ষ্যমাত্রার ১১৯ শতাংশ ধান সংগ্রহ করেছি। গত বছর এটি ছিল ৯৮ শতাংশ। এটি একটি ভালো অর্জন।
তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য ছিল কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। সেই জায়গায় এখনো ঘাটতি রয়ে গেছে।
নীতিমালা সহজ করার দাবি কৃষকের
কৃষকেরা বলছেন, ধান বিক্রিতে নিবন্ধন ও ব্যাংক হিসাবের বাধ্যবাধকতা সহজ করা এবং আর্দ্রতা–চিটার শর্ত বাস্তবমুখী না হলে কৃষকের অংশগ্রহণ বাড়বে না। তারা চান, উৎপাদন খরচ অনুযায়ী ধানের দাম পুনঃনির্ধারণ করা হোক।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.