খুলনা প্রতিনিধি
খুলনা মহানগরীতে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে মাদকব্যবসা ও এর প্রভাব। দিন দিন এই অভিশপ্ত জালে জড়িয়ে পড়ছে কিশোর ও তরুণরা। এতে একদিকে যেমন ধ্বংস হচ্ছে একটি প্রজন্ম, তেমনি বাড়ছে খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য সহিংস অপরাধ। গেল এক বছরে নগরীর আটটি থানায় মাদক-সম্পর্কিত ঘটনায় খুন হয়েছেন ২০ জন, আধিপত্য ও নারীঘটিত বিরোধে খুন হয়েছেন আরও ১৫ জন। সব মিলিয়ে খুনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫-এ।
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে শতাধিক মাদক স্পট। সমাজ ও রাজনীতির সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ না থাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণ সমাজ পড়েছে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, কিশোর-তরুণদের ঘিরে গড়ে উঠছে একাধিক কিশোর গ্যাং, যাদের কর্মকাণ্ডে উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ। এ গ্যাংগুলো মাদক বিক্রি, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার এমনকি খুনাখুনিতেও জড়িয়ে পড়ছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পুলিশ এসব গ্যাংয়ের অস্তিত্ব জানলেও কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি জানিয়েছেন, অনেক মাদক কারবারী প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যকে ‘ম্যানেজ’ করে নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের অবৈধ ব্যবসা। মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে গাঁজা, ইয়াবা বা ফেনসিডিল উদ্ধার করা হলেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের আওতাধীন সদর, সোনাডাঙ্গা, খালিশপুর, দৌলতপুর, হরিণটানা, লবণচরা ও আড়ংঘাটা থানার অধীনে শতাধিক মাদক স্পট সক্রিয় রয়েছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হলেও ধারাবাহিকতা না থাকায় এসব চক্র আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জনবল সংকট সত্ত্বেও নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে অনেক সময় গ্রেপ্তারের পর আসামিরা জামিনে বের হয়ে পুনরায় জড়িয়ে পড়ছে একই অপরাধে।
নাগরিক সমাজের মতে, অভিযান চালানো যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক কঠোরতা। শুধুমাত্র গাঁজা বা ইয়াবা উদ্ধার করে ছবি তুলে প্রচার চালিয়ে নয়, পুরো চক্রকে নির্মূল করতে হবে।
নাগরিক নেতা অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, “খুলনার যুবসমাজ আজ মাদকের ভয়ঙ্কর ছোবলে বিপর্যস্ত। কঠোর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ আরও ভয়াবহ হবে।”
বিএনপি খুলনা মহানগর শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনা বলেন, “খুলনায় রাঘব বোয়ালদের ছত্রছায়ায় মাদকের বিস্তার ঘটছে। প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও সমাজের সব স্তরের মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ছাড়া এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।”
এ বিষয়ে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেলের সহকারী কমিশনার খন্দকার হোসেন আহম্মদ জানান, “মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিটি থানাকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত অভিযানও চলছে। তবে মাদক নির্মূলে শুধু পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয়, প্রয়োজন সমাজের সক্রিয় সহযোগিতা।
সচেতন খুলনাবাসী মনে করছেন, মাদকের ভয়াল থাবা থেকে কিশোর ও তরুণ সমাজকে বাঁচাতে এখনই নিতে হবে সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ। তা না হলে খুব শিগগিরই ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে খুলনা শহর।

