রাসেল আহমেদ,খুলনা প্রতিনিধি
সরকারি হাসপাতাল—যেখানে জীবন বাঁচানোর শেষ আশ্রয় খুঁজে নেয় সাধারণ মানুষ। গরিবের একমাত্র ভরসা থাকে এখানে সুলভে চিকিৎসা, দক্ষ চিকিৎসক ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় কিছুটা নিশ্চিন্ততা। কিন্তু খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সেই আশ্রয়স্থল হয়েও আজ যেন প্রতারণার মঞ্চে পরিণত হয়েছে। রুগ্ন ব্যবস্থাপনার সুযোগে হাসপাতালটির আশেপাশে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য অথচ সুসংগঠিত দালাল সিন্ডিকেট, যারা প্রতিদিন শত শত রোগীকে নিজেদের ফাঁদে ফেলে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাচ্ছে প্রলোভনের বিনিময়ে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৫০০ হলেও প্রতিদিন ভর্তি থাকে এর তিনগুণেরও বেশি রোগী। গত শনিবার হাসপাতালে ভর্তি ছিল দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ। শয্যা না পেয়ে অনেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন করিডোরে, বারান্দায় কিংবা মেঝেতে। চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীদের এই দুরবস্থা কাজে লাগিয়ে সক্রিয় হয় দালালরা। প্রত্যুষে হাসপাতালের গেট, আউটডোর, ওয়ার্ড ঘিরে তাদের চলাফেরা শুরু হয়। একেকজন টার্গেট করে স্বজনদের, ছড়িয়ে দেয় নানা ভয়—এখানে ডাক্তার ঠিকমতো দেখে না, পরীক্ষা করাতে সময় লাগবে, বাইরে গেলে দ্রুত ও ভালো চিকিৎসা পাওয়া যাবে।
সাতক্ষীরার কৃষক আসাবুর জানান, “ডাক্তার প্রেসক্রিপশনের সঙ্গে একটা কাগজ দিলেন। তাতে লেখা মোবাইল নম্বরে ফোন করতেই একজন এসে হাজির। হাতে সিরিঞ্জ, তুলা, ব্যাগ। রক্ত নিয়ে গেল। পরে দেখি রিপোর্ট এসেছে এক বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে। আমরা ভেবেছিলাম, সরকারি সিস্টেমেরই অংশ। পরে বুঝি, প্রতারিত হয়েছি।”
যশোরের গৃহিণী হাফিজা খাতুনও একই অভিজ্ঞতার শিকার। তিনি বলেন, “খুলনা মেডিকেলে এসেছিলাম কম খরচে চিকিৎসা করাতে। কিন্তু এখানে এসে দালালের পাল্লায় পড়ে যা খরচ হলো, তা বেসরকারি হাসপাতালের থেকেও বেশি। একদিকে ধোঁকা, অন্যদিকে ক্ষয়—আমরা ভীষণ নাজেহাল।”
শুধু খরচই নয়, ভুল চিকিৎসা বা অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা অনেক সময় রোগীর অবস্থা আরও খারাপ করে তুলছে। বাগেরহাটের আলমগীর হোসেন তাঁর স্ত্রীর জন্য হাসপাতালে এসেছিলেন। তিনি জানান, “আউটডোরে লাইন ধরেছিলাম। হঠাৎ এক নারী এসে বলল, এখানকার ডাক্তাররা দেখবে না ঠিকমতো, বাইরে ভালো চিকিৎসা হবে। সে পাশের একটি ক্লিনিকে নিয়ে গেল। সেখানকার পরীক্ষা আর ফি—সব মিলিয়ে চার হাজার টাকা গেল। পরে সরকারি ডাক্তার জানাল, এসব পরীক্ষার কোনও দরকারই ছিল না। শুধু টাকাই না, সময়ও নষ্ট হয়েছে, স্ত্রীর অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে।”
নগরীর সুলতানা আক্তার জানান, “প্রথমবার খুলনা মেডিকেলে এসেছি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক নারী আমাকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। বলেছিল ভালো ডাক্তার দেখাবে। আমি একটু সচেতন থাকায় যেতে যাইনি। পরে বুঝেছি, সে একজন দালাল ছিল।”
এই দালাল সিন্ডিকেট একা কাজ করে না। অনেক সময় চিকিৎসক কিংবা হাসপাতালের কর্মচারীদের সঙ্গে রয়েছে সরাসরি যোগসাজশ। একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমাদের সঙ্গে কিছু ডাক্তার আর হাসপাতালের লোক কাজ করে। তারা রোগী পাঠায়, আমরা কমিশন দিই। এটা ওপেন সিক্রেট। অনেক সময় পরীক্ষা ছাড়াও রিপোর্ট দিয়ে দেই, কারণ ডাক্তার তো শুধু কাগজটা চাইছে, রোগীর শারীরিক অবস্থা নয়।”
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভেতরে এভাবে প্রতিদিন যে কমিশন বাণিজ্য চলছে, তা স্বীকার করেন অনেকেই। সূত্র বলছে, দালালদের প্রতিদিনের উপার্জনের একটি অংশ চলে যায় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বা কর্মচারীদের পকেটে। এই বিনিময়ের কারণেই তাদের হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ, রোগী টার্গেট করা কিংবা নমুনা সংগ্রহে কোনো বাধা আসে না। রোগীরা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না, তাদের সঙ্গে প্রতারণা হচ্ছে।
এই অবস্থা বন্ধ করতে গেলেও সমস্যার শেষ নেই। কারণ খুলনা শহরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় শতাধিক বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনেকগুলোরই কাগজপত্র নেই, অনেকে ভুয়া অনুমোদন নিয়ে চলছে। নিয়ম অনুযায়ী ১০ শয্যার ক্লিনিকে তিনজন চিকিৎসক, দুইজন নার্স ও তিনজন সুইপার থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই নেই এই জনবল। বরং চুক্তিভিত্তিক অস্থায়ী ডাক্তার দিয়ে কাজ চালানো হয়। অস্ত্রোপচারের সময় পর্যন্ত চিকিৎসক অনুপস্থিত থাকেন, যার ফল হয় ভয়াবহ।
এই সিন্ডিকেট ভাঙতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একাধিকবার অভিযান চালিয়েছে। জেলা প্রশাসন, র্যাব, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও ভ্রাম্যমাণ আদালত ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৪০টিরও বেশি অভিযান চালিয়েছে। এসব অভিযানে ১৭০ জনের বেশি দালালকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৩ সালে আটক হন ৮৫ জন, ২০২৪ সালে ৬০ জন এবং ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসেই ধরা পড়েন আরও ২৫ জন দালাল। কারও কারও বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হলেও মূল চক্র আজও সক্রিয়। বরং আরও সংগঠিত।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, “যেখানে গরিব মানুষ চিকিৎসার শেষ আশ্রয় খোঁজে, সেই জায়গাটা যদি দালাল সিন্ডিকেট দখল করে নেয়, তবে রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর মানুষ বিশ্বাস রাখবে কীভাবে? হাসপাতালের প্রবেশপথে কড়া নজরদারি, সিসিটিভি, বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ এবং দালাল-সহযোগী চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি ছাড়া এই দুর্নীতি থামবে না।”
নাগরিক নেতা সরদার আবু তাহের বলেন, “সরকারি হাসপাতাল এখন রোগী শিকারের ফাঁদ হয়ে গেছে। অসহায় মানুষকে এই ফাঁদে ফেলে মুনাফা করছে ক্লিনিকগুলো। রোগীরা বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত খরচের বেসরকারি সেবা নিচ্ছে। এটা জাতীয় ব্যর্থতা।”
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. আইনুল ইসলাম জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর এই সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিয়েছেন। তার ভাষায়, “আমি যোগদানের পর থেকেই এই বিষয়ে কাজ করছি। দালালদের উৎখাত ও অনিয়ম রোধে একাধিক কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় আছি। প্রশাসন ও ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইতোমধ্যে মতবিনিময় করেছি। আমরা চাই দ্রুত এসব অনিয়মের অবসান ঘটুক।”
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.