রাসেল আহমেদ,খুলনা প্রতিনিধি
খুলনা-১ (দাকোপ–বটিয়াঘাটা) আসনের রাজনীতিতে হঠাৎ করেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন ডুমুরিয়া উপজেলা হিন্দু কমিটির সভাপতি কৃষ্ণ নন্দী।
দীর্ঘদিন পরে আসনটিতে প্রার্থী দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী; কিন্তু সবার বিস্ময়, দলটি এবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজনকে প্রার্থী করেছে। গত ৩ ডিসেম্বর খুলনায় আট দলের বিভাগীয় সমাবেশে দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান তার নাম ঘোষণা করার পরই এলাকায় আলোচনা, সমালোচনা ও সংশয় সবই একসঙ্গে তৈরি হয়।
রাজনৈতিক পরিচয়ে তিনি জামায়াতের; ধর্মীয় পরিচয়ে হিন্দু। এই অদ্ভুত সমন্বয় স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন কৌতূহল ছড়িয়েছে। এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের নেতার সঙ্গে তার তোলা একাধিক ছবি। বিষয়টি শুধু বিতর্ক নয়, সৃষ্টি করেছে নানা প্রশ্নও।
ডুমুরিয়ার চুকনগর তার পৈত্রিক নিবাস। ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি এলাকায় পরিচিত। মোটরসাইকেল শোরুম থেকে শুরু করে তেল, রড–সিমেন্ট, বহু ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার দাবি, ২০০৩ সালে সাবেক জামায়াত নেতা ও এলাকার প্রভাবশালী রাজনীতিক মিয়া গোলাম পরওয়ারের হাত ধরে তিনি দলে যোগ দেন।
কিন্তু স্থানীয়দের বক্তব্য ভিন্ন। তারা বলছেন, গত বছর ৫ আগস্ট রাজনৈতিক সহিংসতায় ক্ষুব্ধ জনতার হামলা ও অগ্নিসংযোগের আগ পর্যন্ত কৃষ্ণ নন্দীকে রাজনৈতিক মাঠে তেমন দেখা যায়নি। ওই ঘটনার পরই তিনি আবার সক্রিয় হয়ে উঠেন এবং পরে উপজেলা হিন্দু কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পান।
গত ৩১ অক্টোবর জামায়াতের হিন্দু সম্মেলনে তার নেতৃত্বে বিপুলসংখ্যক হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। কিন্তু তার রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়েও বেশি বিতর্ক ছড়িয়েছে ভাইরাল হওয়া ছবিগুলোকে কেন্দ্র করে। সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের ফেসবুকে ছবি তিনটি প্রকাশ করে দাবি করেছেন, সেগুলো ২০১৩ সালের। তিনি আরও দাবি করেন, কৃষ্ণ নন্দী সে সময় ভারতে অবস্থান করেছিলেন এবং ফরেন্সিক বিশ্লেষণে ছবিগুলোতে কোনো ধরনের এআই বা টেম্পারিংয়ের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এমনকি ওই বৈঠকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা আইবি-র সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা ছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অপরদিকে কৃষ্ণ নন্দী এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “ছবি দেখে মনে হচ্ছে কারও সঙ্গে মিলিয়ে একটি এআই ছবি বানানো হয়েছে। আমি ওই ব্যক্তিকে চিনি না, কোনো সম্পর্কও নেই।”
তার রাজনৈতিক অতীত নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ। তাদের অভিযোগ, কৃষ্ণ নন্দী ছিলেন সাবেক মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের ঘনিষ্ঠজন। মন্ত্রীর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে তোলা অনেক ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরছে। স্থানীয়রা বলছেন, সেই ঘনিষ্ঠতার কারণেই ৫ আগস্টের সহিংসতায় তার ব্যবসা ও ঘরবাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। নিজেদের নিরাপদ রাখতে তিনি এখন জামায়াতে আশ্রয় নিয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে কৃষ্ণ নন্দী বলেন, ব্যবসায়ী হিসেবে মন্ত্রীর সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। কিন্তু ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বলা হচ্ছে’।
খুলনা-১ আসনটি দেশের অন্যতম হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। দাকোপ উপজেলায় হিন্দুর সংখ্যা ৫৪ শতাংশের বেশি; বটিয়াঘাটায় প্রায় ২৮ শতাংশ। সব মিলিয়ে এ আসনের প্রায় ৪৩ শতাংশ ভোটার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। স্বাধীনতার পর থেকে এই আসনে বারবার সংখ্যালঘু প্রার্থীরাই বিজয়ী হয়েছেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ননী গোপাল মণ্ডল জয় পান। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরেই আসনটি আওয়ামী লীগের ‘শক্ত ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত।
জামায়াত এ আসনে সর্বশেষ প্রার্থী দিয়েছিল ১৯৯৬ সালে। প্রায় তিন দশক পর এবারের নির্বাচনে প্রথমে মাওলানা আবু ইউসুফকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও পরে তা বদলে কৃষ্ণ নন্দীকে চূড়ান্ত প্রার্থী করা হয়। এ প্রার্থী বদলও নতুন করে মাঠে প্রশ্ন তুলেছে। মনোনয়ন হারানো আবু ইউসুফ অবশ্য দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে প্রচারণায় নেমেছেন।
অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী আমীর এজাজ খানও মাঠে সক্রিয়। আগের নির্বাচনে অংশগ্রহণমূলক ভোটে তিনি উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছিলেন। ফলে তিন দলের এই সমীকরণে আসনটি নিয়ে নতুন হিসাব–নিকাশ শুরু হয়েছে।
সব বিতর্কের পরও কৃষ্ণ নন্দী আত্মবিশ্বাসী। তিনি বলছেন, এলাকায় তার বিপুল আত্মীয়স্বজন ও সমর্থক রয়েছে। “দাকোপ ও বটিয়াঘাটা আমাকে গ্রহণ করেছে। ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রেখে সবার জন্য রাজনীতি করতে চাই।”
রাজনৈতিক অঙ্গন, মাঠের কর্মীরা এবং ভোটার, সবাই এখন প্রশ্নে মুখর: বিতর্ক, অতীত রাজনৈতিক অবস্থান, এবং ভাইরাল হওয়া ছবির মাঝে দাঁড়িয়ে কৃষ্ণ নন্দী কতটা লড়াই করতে পারবেন? উত্তাপ বাড়ছে নির্বাচনী মাঠে, বাড়ছে কৌতূহলও।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.