পটুয়াখালী প্রতিনিধি
পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনে সাবেক এমপি শহিদুল আলম তালুকদারকে ধানের শীষের প্রার্থী ঘোষণা করার পরপরই তুমুল প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে।
কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে “অবৈধ, তৃণমূল–বিরোধী ও জনমতের পরিপন্থী” মন্তব্য করে তারা বিক্ষোভ, মশাল মিছিল, জরুরি সভা, প্রতিবাদ সমাবেশে পুরো উপজেলা উত্তাল করে তুলেছেন। মনোনীত প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করে কেন্দ্রীয় সহ-দপ্তর সম্পাদক মো. মুনির হোসেন অথবা নির্বাহী কমিটির সদস্য শিল্পপতি ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম ফারুক তালুকদারকে পুনরায় মনোনয়ন প্রদানের দাবিতে তারা ঘোষণা দিয়েছেন টানা আন্দোলনের।
মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই বাউফলের রাজনৈতিক আবহে আগুন জ্বলতে শুরু করে। শনিবার ও রোববারের কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় সোমবারও বিক্ষোভ চলবে।
বিশেষ করে রোববার (৭ ডিসেম্বর) বিকেলে পৌর শহরের হাজন দালাল মার্কেটে অনুষ্ঠিত উপজেলা বিএনপির জরুরি সভায় উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আ. জব্বার মৃধা। সদস্য সচিব আপেল মাহমুদ ফিরোজ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন—ঘোষিত প্রার্থী বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে কখনো নেতৃত্ব দেননি, তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ নেই, এমনকি অতীতে ধানের শীষের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর বক্তব্য—“এমন সিদ্ধান্ত বাউফল বিএনপির প্রতি চরম অবমাননা। আমরা এই মনোনয়ন কোনোভাবেই মেনে নেব না।”
কাছিপাড়া, আদাবারিয়া, বাউফল সদরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে বিক্ষোভ, সড়ক প্রদক্ষিণ, মশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয় একই দাবিতে। বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন—যে সময় আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসনে বিএনপি নেতাকর্মীরা গ্রেফতার-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, সে দুর্দিনে মনোনীত প্রার্থী রাজপথে ছিলেন না এবং তৃণমূল কর্মীদের পাশে দাঁড়াননি। তাছাড়া ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি দলীয় প্রার্থীর বিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ ওঠে।
সেসব কারণেই তৃণমূল এই মনোনয়নকে ‘দলবিরোধী, ষড়যন্ত্রমূলক ও কর্মীদের প্রতি অশ্রদ্ধা’ হিসেবে দেখছে।
পৌর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ পলাশ বলেন, “যার অতীত আওয়ামী লীগপন্থী প্রার্থীদের দিকে ঝুঁকে ছিল, তাকে আমরা কোনোভাবেই গ্রহণ করি না। মনোনয়ন বাতিল করতেই হবে। ত্যাগী নেতা মুনির হোসেন ও ফারুক তালুকদারই বাউফলের যোগ্য নেতৃত্ব।”
যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মৎস্যজীবী দল, তাতী দলসহ সহযোগী সংগঠনের নেতারাও একই সুরে বলেন—মনোনীত ব্যক্তি দলের দুর্দিনে অনুপস্থিত ছিলেন, আর তৃণমূলের এই স্মৃতি এখনও সতেজ।
জরুরি সভায় বক্তব্য দেন—আহ্বায়ক জব্বার মৃধা, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান খোকন, যুবদলের সদস্য সচিব বশির পঞ্চায়েত, পৌর যুবদলের সদস্য সচিব মানুন খান, তাতী দলের আহ্বায়ক জামাল মুন্সী, মৎস্যজীবী দলের আহ্বায়ক লিটন খান, সাবেক ছাত্রদল নেতা মুনঈমূল ইসলাম মিরাজসহ অনেকে।
তাদের বক্তব্যে ঘুরেফিরে উঠে আসে—ঘোষিত প্রার্থী দলের সংগ্রাম-ইতিহাসে অনুপস্থিত, ধানের শীষের প্রতি তাঁর আনুগত্য প্রশ্নবিদ্ধ এবং তৃণমূল তাকে সর্বসম্মতভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। সভা শেষে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে উপজেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে শেষ হয়।
নেতাকর্মীরা স্লোগান দেন—“আনারস মার্কার নমিনেশন মানি না মানবো না”, “মুনির হোসেন–ফারুক তালুকদার ছাড়া আর কাউকে মানি না”, “ঘোষিত নমিনেশন বাতিল করতেই হবে।” ৪ ডিসেম্বর মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই দুই হেভিওয়েট প্রার্থী—মুনির হোসেন এবং ইঞ্জিনিয়ার ফারুক তালুকদারের সমর্থকরা লাগাতার বিক্ষোভ করে আসছেন। শনিবার ও রবিবার রাতেও বড় মিছিল হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিন নেতাই বাউফলে দীর্ঘদিন ধরে ‘ক্লিন ইমেজ’ ধারণ করে পরিচিত ছিলেন। ছাত্রদল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত উঠে আসা ত্যাগী নেতা মুনির হোসেন এবং ব্যবসা ধ্বংস করে দলকে বাঁচানো দানবীর ইঞ্জিনিয়ার ফারুক তালুকদারের জনপ্রিয়তা তৃণমূলে ব্যাপক।
অন্যদিকে সাবেক এমপি হিসেবে সাধারণ ভোটারের মাঝে শহিদুল আলম তালুকদারের একটি শক্ত অবস্থান রয়েছে। তবে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে দূরত্ব ও অতীতের বিতর্ক তাঁকে নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
কেন্দ্রীয় নেতা হওয়ায় মুনির হোসেন ও ফারুক তালুকদারের রয়েছে দলীয় নীতিনির্ধারণে উল্লেখযোগ্য প্রভাব। আর সাধারণ মানুষের মাঝে শহিদুল আলম তালুকদারের রয়েছে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা। কিন্তু এবারের নির্বাচনে ঐক্য গড়ে তোলাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, এবং সেই পরীক্ষায় ঘোষিত প্রার্থী কতটা সফল হবেন—তা এখন দেখার বিষয়।
বাউফল আজ অপেক্ষা করছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে। তৃণমূল স্পষ্ট করে দিয়েছে—মনোনয়ন পরিবর্তন না হলে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে, এবং কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত তারা মানবে না। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামার ঘটনা জানতে বাউফল উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আপেল মাহমুদ ফিরোজকে জিজ্ঞেস করলে তিনি উপজেলা বিএনপির আহবায়ক জব্বার মেদ্ধার যানান অনেক জায়গায়ই তো প্রার্থী পূর্ণ বিবেচনা দাবিতে মিছিল মিটিং হচ্ছে। তাই আমরাও করছি। আমি অসুস্থ। এ ব্যাপারে আহবায়ক কমিটি বলতে পারবে।
তিনি উপজেলা বিএনপির আহবায়ক জব্বর মিদ্দার মোবাইল নাম্বার দিয়ে তার সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। তবে উপজেলা বিএনপির আহবায়ক জব্বার মৃধার মোবাইলে বারবার ফোন দিয়েও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
বাউফলের রাজনীতি উত্তাল—সমীকরণ জটিল—আর সমাধানের চাবিকাঠি এখন সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত ও ঘোষিত প্রার্থীর কৌশলের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল।

