নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারি চাকরিতে বদলি একটি রুটিন মাফিক প্রক্রিয়া। কিন্তু কিছু কিছু বিদায় মুহূর্ত সাধারণ মানুষের হৃদয়ে গভীর দাগ কেটে যায়, তৈরি করে এক শূন্যতা। যার নির্ঘুম রাত আর অক্লান্ত পরিশ্রমে স্বস্তি ফিরেছিল জনমনে। সেই জনবান্ধব মানবিক ওসি জাহিদুল ইসলামের হটাৎ বিদায়ে উপজেলার সর্বস্তরের মানুষের মাঝে নেমে এসেছে বিষাদের ছায়া, যেটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে টুঙ্গিপাড়া উপজেলার মানুষের।
কারন টুঙ্গিপাড়া থেকে তার বদলী হয়েছে খুলনা জেলার কয়রা থানায়। ইতিমধ্যে সেখানে যোগাদান ও করেছেন তিনি।
জানা যায়, মাত্র তিন মাস টুঙ্গিপাড়া থানায় দ্বায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। দায়িত্ব গ্রহণের পর তার সময়টা ছিল সবচেয়ে ক্রিটিকাল ও অগ্নিগর্ভা। কারন এই সময়টাতে অনেক বড় বড় ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা ছিল টুঙ্গিপাড়ায়। কিন্তু তার কৌশলী, বিচক্ষণ ও জনবান্ধব পদক্ষেপ, আর মানুষের তার প্রতি শ্রদ্ধা থাকায় অন্য তেমন কোন ঘটনাই ঘটেনি। তাছাড়া কোন ঘটনা ঘটার উপক্রম দেখা দিলে, সবার আগে ওসি ঘটনাস্থলে চলে গিয়েছে। যেটাও ছিলো একটা অনন্য চিত্র। তার সেবার কোন ভেদাভেদ ছিল না, ছিল না কোন বৈষম্য। ধর্মবর্ণ সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে তিনি সেবা দিয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে ওসি ছিলেন আপসহীন। তার যোগদানের পূর্বে এলাকায় যেসব ছোট-বড় অপরাধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, তা দমনে তিনি গ্রহণ করেছেন কঠোর পদক্ষেপ। অপরাধ দমনে তার 'জিরো টলারেন্স' নীতি এবং রাতজাগা টহল উপজেলার সাধারণ মানুষকে দিয়েছিল গভীর নিরাপত্তা বোধ।
মাদক নির্মূল, সন্ত্রাস দমন, ইভটিজিং রোধ ও জুয়া বন্ধে তার নেওয়া সাহসী ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতো ওসি জাহিদুল। বিশেষ করে জমি সংক্রান্ত ঝামেলা সহ মানুষের ছোট বড় বিরোধ মিটিয়ে প্রশংসিত হয়েছেন সর্বমহলে।
আক্ষরিক অর্থেই, ওসি জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীরের নির্ঘুম পরিশ্রমের ফসল ছিল উপজেলার মানুষের শান্তির ঘুম। তার নির্দেশে পুলিশের কঠোর নজরদারির কারণে এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রেখেছিলো। তবে শুধু কঠোর পুলিশিং নয়, ওসি জাহিদুল ইসলামের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তার সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, পুলিশ জনগণের বন্ধু। থানার দরজা তিনি সবার জন্য উন্মুক্ত রেখেছিলেন। ধনী-দরিদ্র, প্রভাবশালী কিংবা সাধারণ দিনমজুর—নির্বিশেষে সবাই তার কাছে সমান ন্যায়বিচার পেতেন। বিচারপ্রার্থীদের অভিযোগ মনোযোগ সহকারে শোনা এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক।
তার বদলির সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের আবেগঘন অনুভূতি প্রকাশ করছেন।
স্থানীয় এক প্রবীণ সমাজসেবকের মতে, "ওসি জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর টুঙ্গিপাড়ায় যোগদান করার পর থেকে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বাজারে গিয়ে কথা বলে মানুষকে শেখাতে চেষ্টা করেছেন। স্কুল ও কলেজে গিয়ে ছাত্রীদের বাল্য বিবাহের কুফল সম্পর্কে জানিয়েছেন। এছাড়া বাবা-মা ও শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা সহ মাদক, জুয়া সহ বিভিন্ন সময়ে বক্তব্য দিয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এছাড়া জিটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন একজন শিক্ষকের পক্ষে নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিলো, তখন তিনি খবর পেয়েই সেখানে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে বিদ্যালয়ে ফেরান। মূলত আলোকিত ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ যেখানেই কাজ করেন সেখানেই আলোকিত করে থাকে। এতো সল্প সময়ে তার মতো সৎ ও কর্মঠ অফিসারের বদলী উপজেলাবাসীর জন্য মেনে নেয়া কঠিন।
পাটগাতী বাজারের ব্যবসায়ী গোপাল সরকার বলেন, ওসি জাহিদুল ইসলাম মাত্র তিন মাস দায়িত্বপালন করেছেন টুঙ্গিপাড়া থানায়। তার এই সময়টাতে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের কোনো ভয় ছিল না। ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পেরেছেন। তার নির্দেশে পুলিশের কঠোর নজরদারির কারনে বাজারে চুরির কোন ঘটনা ঘটেনি। ব্যবসায়ীরা বেশ শান্তিতে ছিলো। মানুষের জন্য কাজ করার মন মানসিকতা সবার থাকে না। তাই তার পরবর্তী কর্মস্থলের জন্য শুভকামনা রইলো।
বিদায় বেলায় ওসি জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর বলেন, "আমি শুধু আমার ওপর অর্পিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি। এই উপজেলার মানুষ ও আমার সহকর্মীরা আমাকে অনেক ভালোবাসা দিয়েছে ও সহযোগিতা করেছে। এছাড়া টুঙ্গিপাড়া উপজেলার সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ যেকোন কাজে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে। তাই আমার সহকর্মী ও টুঙ্গিপাড়া উপজেলায় মানুষের প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ। আমার কাজের মাধ্যমে যদি সামান্যতম শান্তিও আমি দিতে পেরে থাকি, তবে সেটাই আমার সার্থকতা।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.